কয়েক ঘণ্টা আগেই উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে রাজি হওয়া সত্ত্বেও লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন। এই সহিংসতা ভঙ্গুর শান্তিপ্রক্রিয়াকে সুসংহত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনাকে ব্যাহত করার হুমকি সৃষ্টি করছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
গত সপ্তাহে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ওপর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার পরবর্তী আলোচনা আজ রোববার সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে অনুষ্ঠিত হবে বলে গতকাল শনিবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়। এতে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন এবং পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীরাও উপস্থিত থাকবেন।
তবে দক্ষিণ লেবাননে চলমান ইসরায়েলি বিমান ও ড্রোন হামলা পরিকল্পিত এই আলোচনাকে জটিল করে তুলেছে। ইরান লেবাননে যুদ্ধবিরতিকে এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার জন্য অপরিহার্য মনে করে এবং এটি মার্কিন-ইরান আলোচনাকে ‘সফল বা ব্যর্থ’ করতে পারে বলে মনে করছে। অথচ গত শুক্রবারই ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে।
লেবাননের সিভিল ডিফেন্স এজেন্সি জানিয়েছে, শনিবার দেশের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়েহ জেলায় ইসরায়েলি হামলায় ১৬ জন নিহত এবং ১২ জন আহত হয়েছে। লেবাননের ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, কফার রেমান গ্রামে ইসরায়েলি হামলায় এক লেবানিজ সেনা নিহত হয়েছেন।
সংবাদ সংস্থাটি টায়ার জেলায় ইসরায়েলি হামলার খবর দিয়েছে। সেখানে বারিশ গ্রামে একটি ইসরায়েলি হামলায় একই পরিবারের চার সদস্য—বাবা, মা এবং তাদের দুই সন্তান নিহত হয়েছেন। তারা আরও জানায়, পশ্চিম বেকার সোহমোর এলাকায় একটি পরিবারের ওপর ইসরায়েলি বিমান হামলায় চারজন নিহত এবং একজন আহত হয়েছে।
লেবাননের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার জানিয়েছে, সিডন জেলার কানারিতে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত সাতজন নিহত এবং ১৩ জন আহত হয়েছে। লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার পুনর্নবীকৃত যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরপরই ইসরায়েলি হামলায় ৮৩ জন নিহত এবং ১৪১ জন আহত হয়েছে। হতাহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই দক্ষিণ লেবাননের, অন্যরা দেশের পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা।
শনিবার লেবাননের টায়ার থেকে আল জাজিরার হেইডি পেট জানান, মধ্যরাত থেকে দক্ষিণ লেবাননে ১০০টির বেশি ইসরায়েলি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এখানে আজকের দিনটি ছিল বিধ্বংসী; নিহত ও আহত ব্যক্তিদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিকেরাও রয়েছেন।’
পেট যোগ করেন, ‘আজ লেবাননের সেনাবাহিনীর সেনারাও নিহত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে একজন মোটরবাইকে থাকা অবস্থায় সুনির্দিষ্ট হামলার শিকার হন। এটি লেবাননের সেনাবাহিনীর কাছ থেকে বেশ সমালোচনামূলক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে, যারা সাধারণত রাজনীতি থেকে দূরে থাকে।’
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শনিবার আরও জানিয়েছে, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪ হাজার ৫৭ জন নিহত এবং ১২ হাজার ১২১ জন আহত হয়েছে।
বৈরুত থেকে আল জাজিরার রব ম্যাকব্রাইড জানিয়েছেন, এটি এই যুদ্ধবিরতির ভঙ্গুর প্রকৃতিকে নির্দেশ করে এবং এটিও দেখায় যে পুরো আলোচনা প্রক্রিয়াটি লেবানন এবং আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোতে এখানে কী ঘটে তার ওপর নির্ভরশীল বলে মনে হচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ১ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, লেবাননে যুদ্ধের অবসান সব ফ্রন্টে সামগ্রিক যুদ্ধবিরতি ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। লেবাননের সেনাবাহিনী শনিবার এক বিবৃতিতে বলেছে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলার ধারাবাহিকতার উদ্দেশ্য হলো দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করা।
লেবাননের এমপি নাজত আউন সালিবা আল জাজিরাকে বলেন, লেবাননের মানুষ ক্লান্ত এবং তারা এই হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের (সরকার) অনেক অর্থ এবং প্রচুর কষ্টের কারণ হচ্ছে’, এবং তিনি যোগ করেন যে ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহ উভয়ই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে সুবিধা পাওয়ার জন্য লেবাননের ভূখণ্ড ব্যবহার করছে।
হিজবুল্লাহ শনিবার জানিয়েছে, তারা রাতারাতি নাবাতিয়াহর কাছাকাছি একটি এলাকার দিকে অগ্রসর হওয়া ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করেছে।
এর পরপরই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী একটি বিবৃতি প্রকাশ করে জানায়, হিজবুল্লাহ রাতারাতি দক্ষিণ লেবাননে কর্মরত সৈন্যদের লক্ষ্য করে ৫০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে এবং এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আরও ঘোষণা করেছে, দক্ষিণ লেবাননে তাদের অভিযানে আরেকজন সেনা নিহত হয়েছে, যে মার্কিন-ইরান চুক্তি হওয়ার পর থেকে মারা যাওয়া পঞ্চম সেনা।
২০২৪ সালের নভেম্বরে ইসরায়েল ও লেবানন একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর পর থেকে লেবানন সরকার মার্কিন-সমর্থিত একটি রোডম্যাপের অংশ হিসেবে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করছে। লেবানন সরকার দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলের প্রত্যাহারের জন্যও চাপ দিয়ে আসছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে একটি চুক্তির পাঠ্য অনুযায়ী দক্ষিণ লেবাননের লিটানি নদীর উত্তরে হিজবুল্লাহর প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হলেও এতে ইসরায়েলের সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়নি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে নতুন দফার আলোচনা আগামী ২৩ ও ২৫ জুন ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত হবে এবং এর উদ্দেশ্য হবে ‘একটি স্থায়ী শান্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া।’
পররাষ্ট্র দপ্তরের মতে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শুক্রবার লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনকে বলেছেন, ‘ইসরায়েলের সঙ্গে লেবাননের দ্বিপক্ষীয় আলোচনাই পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং সহিংসতার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করার একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ।’
তবে এই আলোচনায় হিজবুল্লাহকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যা অর্থপূর্ণ কোনো অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। শনিবার লেবাননের পার্লামেন্টে হিজবুল্লাহর প্রতিনিধি আলি ফাইয়াদ ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে বলেছেন, লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বাহিনী থাকা অবস্থায় এই সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে এবং সতর্ক করেছে, যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।
ফাইয়াদ বলেন, ‘প্রতিরোধের (রেজিস্ট্যান্স) অবস্থান স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন, অ-আলোচনাযোগ্য এবং অপরিবর্তনীয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘শত্রু যখন লক্ষ্যবস্তু করা এবং হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, তখন যুদ্ধবিরতি অর্থহীন। আত্মরক্ষার অধিকার আমাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত এবং এটি কোনো দর-কষাকষি বা আলোচনার বিষয় নয়।’