হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৬০ দিনের চুক্তি শেষে হরমুজে বিমা ফি নেবে ইরান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ফাইল ছবি

হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক জাহাজের ওপর ভবিষ্যতে ‘বীমা ফি’ আরোপের পরিকল্পনা করছে ইরান। একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া ৬০ দিনের সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এই ব্যবস্থা চালু করতে চায় তেহরান। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ কার্যকর হলে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ আরও দৃশ্যমান ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে। তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে প্রতিবেশী ওমানের অবস্থান, কারণ প্রণালিটির জলসীমা ইরান ও ওমানের মধ্যে বিভক্ত।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চুক্তির সময় ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ফি আরোপ না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এই সমঝোতাকে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ নামে উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে চুক্তিতে পরবর্তী সময়ে নতুন কোনো ব্যবস্থার সুযোগ খোলা রাখা হয়েছিল।

এদিকে তেহরান সম্প্রতি পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ–পিজিএসএ নামে একটি নতুন সংস্থা গঠন করেছে। সংস্থাটি নৌপরিবহন শিল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছে, যেখানে ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর নতুন ফি চালুর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

সামুদ্রিক গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক প্রকাশনা লয়েডস লিস্টের তথ্য অনুযায়ী, চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে জাহাজমালিকদের জন্য বীমা সুবিধা বিনা মূল্যে দেওয়া হচ্ছে এবং এর সব ব্যয় বহন করছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান। তবে একই সঙ্গে পিজিএসএ জানিয়েছে, ভবিষ্যতে তারা বীমা ফি চালুর অধিকার সংরক্ষণ করে। তখন জাহাজমালিকদের ওই কভারেজ কিনতে হবে এবং নিয়মিত নবায়ন করতে হবে।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় জাহাজগুলোকে নির্ধারিত রুট অনুসরণ করতে হবে এবং সেই পথ ইরানের লারাক দ্বীপের পাশ দিয়ে যাবে। পিজিএসএ সতর্ক করে বলেছে, নির্ধারিত রুট থেকে কোনো বিচ্যুতি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং তা নিয়ম লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। নতুন কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, এখন থেকে ট্রানজিট আবেদন প্রক্রিয়াকরণ ও অনুমতিপত্র ইস্যুর দায়িত্ব তাদের হাতে থাকবে। কোনো পক্ষ নিয়ম না মানলে জরিমানা আরোপ, চলাচলের অনুমতি বাতিল কিংবা আরও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করবে তারা।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে পিজিএসএ–এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

বিভক্ত বৈশ্বিক নৌপরিবহন খাত

হরমুজ প্রণালিতে ফি আরোপের প্রশ্নে বৈশ্বিক শিপিং শিল্পে মতভেদ দেখা দিয়েছে। গ্রিক শিপিং ব্যবসায়ী ইভানজেলোস মারিনাকিস সম্প্রতি বলেন, প্রণালি খোলা রাখতে হলে তিনি ইরানকে ট্রানজিট ফি দিতে প্রস্তুত। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে ইরানের যে ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতি আংশিকভাবে পুষিয়ে দিতেও এই অর্থ ভূমিকা রাখতে পারে।

মিডল ইস্ট আইয়ে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, যুদ্ধঝুঁকির বিপুল অতিরিক্ত বীমা ব্যয় বহনের চেয়ে নিরাপদ ও তাৎক্ষণিক চলাচলের জন্য টোল দেওয়া তাঁর কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য।

তবে অধিকাংশ পশ্চিমা জাহাজমালিক ও সামুদ্রিক সংগঠন এই অবস্থানের বিরোধিতা করছে। গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোতাকিস মে মাসে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, ইরানের এই জলপথে টোল আরোপ করা উচিত নয়। বৈশ্বিক নৌপরিবহনে গ্রিক পরিবারগুলোর বড় প্রভাব রয়েছে এবং বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জাহাজবহর তাদের নিয়ন্ত্রণে।

অন্যদিকে বড় জাহাজমালিক জর্জ প্রোকোপিউ প্রকাশ্যে ফি দেওয়ার বিরোধিতা করলেও তাঁর প্রতিষ্ঠান ডাইনাকম যুদ্ধকালীন সময়ে হরমুজ দিয়ে জাহাজ পাঠানো অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের একটি ছিল। মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয় প্রতিষ্ঠানটি চীনা ইউয়ানে ইরানকে ট্রানজিট ফি পরিশোধ করেছে।

আন্তর্জাতিক আইন কী বলছে

হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ২১ নটিক্যাল মাইল। এর জলসীমা ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক সীমানার মধ্যে পড়ে। জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক সনদ (আনক্লস) অনুযায়ী, সাধারণ অবস্থায় কোনো দেশ নিজেদের আঞ্চলিক জলসীমা দিয়ে চলাচলের জন্য টোল আরোপ করতে পারে না, যদিও সেই জলসীমা তাদের সার্বভৌম ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান চাইলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নজির দেখিয়ে নিজেদের অবস্থানকে যুক্তিসঙ্গত হিসেবে তুলে ধরতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়া টরেস প্রণালিতে বাধ্যতামূলক পাইলটেজ ফি নেয়। কারণ ওই জলপথকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

একইভাবে ১৯৩৬ সালের মন্ট্রু কনভেনশনের আওতায় তুরস্ক বসফরাস ও দারদানেলস প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজের ওপর টনেজ ফি আরোপ করে। এই অর্থ নিরাপত্তা, উদ্ধার কার্যক্রম ও পরিবেশগত সেবায় ব্যয় করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরাসরি ‘টোল’ না বলে ‘বীমা ফি’ হিসেবে এই অর্থ আদায়ের চেষ্টা ইরানের জন্য একটি আইনি বিকল্প পথ তৈরি করতে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ ওমান

বিশ্লেষকদের মতে, পুরো পরিকল্পনার সফলতা অনেকটাই নির্ভর করছে ওমানের ওপর। যদি মাসকট এই উদ্যোগের বিরোধিতা করে, তাহলে তারা নিজেদের জলসীমা আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে জাহাজগুলো ইরানি অংশ এড়িয়ে চলাচল করতে পারবে। তখন প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ইরানকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে হতে পারে।

মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যৌথভাবে টোল আরোপের ধারণা প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান না করায় এ মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওমানকে ‘উড়িয়ে দেওয়ার’ হুমকি দেন। অন্যদিকে ওমানি কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত আলোচনায় ইঙ্গিত দিয়েছেন, আনক্লসের আওতায় হরমুজে নির্দিষ্ট ধরনের ফি আরোপের বিষয়ে তারা পুরোপুরি আপত্তিকর অবস্থানে নেই।

এ বিষয়ে ওমানি ভাষ্যকার জাকারিয়া আল-মুহারমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ইরানি অংশ দিয়ে চলাচল করলে ওমানের আপত্তি নেই। তবে ভূরাজনৈতিক বা নিরাপত্তাজনিত কারণে জাহাজগুলোকে যদি ওমানের জলসীমা ব্যবহার করতে হয়, তাহলে সেই চলাচল নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও পরিবেশগতভাবে দায়িত্বশীল রাখা ওমানের সার্বভৌম দায়িত্ব। তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদের আওতায় উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো নির্দিষ্ট সেবা দেওয়ার বিনিময়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি আদায় করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি: সংলাপে যোগ দিতে সুইজারল্যান্ডের পথে শাহবাজ শরিফ ও আসিম মুনির

যুদ্ধবিরতির মধ্যেই লেবাননে ৩২ জনকে হত্যা করল ইসরায়েল, হুমকির মুখে ইরান-মার্কিন শান্তি আলোচনা

সুইজারল্যান্ডের পথে ইরানি আলোচকেরা, লেবাননে হামলা অব্যাহত ইসরায়েলের

আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা ইরানের

ইয়েমেনের সরকারি কর্মীদের বেতন মেটাতে ৬ কোটি ডলার দিচ্ছে সৌদি আরব

গাজায় ‘যুদ্ধবিরতির’ আট মাসে দৈনিক একটি শিশুহত্যা করেছে ইসরায়েল: ইউনিসেফ

বিশেষ দূত ও জামাতাকে সুইজারল্যান্ডে পাঠালেন ট্রাম্প, স্থায়ী চুক্তির লক্ষ্যে যাচ্ছেন আরাঘচি

লেবাননে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ

পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলার জন্য ইরাকে গোপন সেল গঠন করছে ইরান

হরমুজে ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ তুলে নিল যুক্তরাষ্ট্র