গাজা উপত্যকার খান ইউনিস ও দেইর আল-বালাহর বিধ্বস্ত পাড়াগুলোতে প্রতিদিন ইসরায়েলি ড্রোনের গর্জন ও নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দ শোনা যায়। এগুলো স্থানীয়দের বারবার মনে করিয়ে দেয়—যুদ্ধ কখনো শেষই হয়নি। গত বছরের অক্টোবর থেকে তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। পরিবর্তিত এই বাস্তবতায় ইসরায়েল ফের অঞ্চলটিতে আবারও যুদ্ধ শুরু করার হুমকি দিয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
গাজার পরিবারগুলো এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মরদেহ উদ্ধার করছে। স্থানীয় চিকিৎসা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই তথাকথিত যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৮২৮ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। এরই মধ্যে গাজার মানুষ আবারও নতুন সামরিক হামলার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। কারণ, ইসরায়েল হুমকি দিচ্ছে—এই ভঙ্গুর চুক্তি বাতিল করে হামাসের আত্মসমর্পণ আদায় করা হবে।
গতকাল রোববার জেরুজালেমে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার নির্ধারিত বৈঠক হঠাৎ বাতিল করেন। এর বদলে তিনি ছোট পরিসরে পরামর্শ বৈঠক করেন। একই সময়ে সামরিক বাহিনী আবারও সংঘর্ষ শুরু করার পক্ষে চাপ বাড়িয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর জেনারেল স্টাফের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইসরায়েলি সম্প্রচারমাধ্যম চ্যানেল-১৫-কে জানান, হামাস অস্ত্র সমর্পণে অস্বীকৃতি জানানো এবং যুদ্ধবিরতি তদারকির দায়িত্বে থাকা বহুজাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্সের তথাকথিত ব্যর্থতার কারণে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়া ‘প্রায় অনিবার্য’।
ইসরায়েলের আর্মি রেডিও জানিয়েছে, গাজায় তাদের বাহিনী ধীরে ধীরে দখলকৃত এলাকা বাড়িয়ে চলেছে। যুদ্ধবিরতির আওতায় নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’ ধাপে ধাপে পশ্চিম দিকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে তারা এখন গাজার ৫৯ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। প্রতিদিন যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের মাধ্যমে এই দখলকে নিয়মিত রূপ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে লেবানন সীমান্ত থেকে অতিরিক্ত সেনা গাজা ও দখলকৃত পশ্চিম তীরে সরিয়ে আনা হয়েছে।
এদিকে, কায়রোতে মধ্যস্থতাকারীরা ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর ওপর তীব্র চাপ প্রয়োগ করছেন, যাতে তারা নতুন একটি কাঠামো মেনে নেয়। এই কাঠামোটি প্রস্তাব করেছেন যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পরিষদের হাইরিপ্রেজেন্টেটিভ নিকোলাই ম্লাদেনভ।
হামাসের পলিটিক্যাল ব্যুরোর সদস্য আবদুল জব্বার সাঈদ ফিলিস্তিনি ওয়েবসাইট আল্ট্রা প্যালেস্টাইনকে বলেন, এই পরিকল্পনার আওতায় পাঁচ ধাপে ২৮১ দিনের মধ্যে হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণে বাধ্য করা হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই প্রস্তাবে মানবিক সহায়তা, পুনর্গঠন ও গাজার প্রবেশপথ খোলা—সবকিছুই অস্ত্র হস্তান্তরের সঙ্গে কঠোরভাবে শর্তযুক্ত করা হয়েছে। বিশ্লেষক ও ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা আগে থেকেই সতর্ক করেছেন, এই কাঠামো মূলত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সম্পূর্ণ ‘রাজনৈতিক আত্মসমর্পণে’ বাধ্য করার কৌশল।
বিশ্লেষকদের মতে, গাজার বেসামরিক প্রশাসন ও পুনর্গঠনের দায়িত্বে নিয়োজিত নবগঠিত ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজাকে (এনজিএসি) ধীরে ধীরে দখলদার শক্তির পরোক্ষ নিরাপত্তা বাহিনীতে রূপান্তর করার পরিকল্পনাই এখানে কাজ করছে। সাঈদ আরও জানান, হামাস, প্যালেস্টাইনিয়ান ইসলামিক জিহাদ এবং পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইনসহ সব ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী একযোগে এই নিরস্ত্রীকরণ শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বরং যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে, যা অনুযায়ী প্রতিদিন ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশ করার কথা ছিল—কিন্তু ইসরায়েল তা বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে।
গাজার রাজনৈতিক বিশ্লেষক উইসাম আফিফা আল জাজিরাকে বলেন, হামাস কূটনৈতিক চাপ সামাল দিতে নিরাপত্তা ইস্যুকে সরাসরি রাজনৈতিক অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করছে। তাঁর ভাষায়, ‘ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনগুলো বলছে, নিরস্ত্রীকরণ কেবল তখনই সম্ভব, যখন একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট পথ তৈরি হবে এবং দখলদারত্বের পূর্ণ অবসান ঘটবে।’
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অস্ত্রের প্রশ্নকে রাজনৈতিক সমাধান থেকে আলাদা করতে চাইছে—অর্থাৎ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের নিশ্চয়তা ছাড়াই মানবিক সহায়তাকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার বানানো হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় যুদ্ধের এই বাড়তি তৎপরতা অন্যত্র ইসরায়েলের কৌশলগত ব্যর্থতা আড়াল করার একটি প্রচেষ্টা হতে পারে। ইসরায়েল-বিষয়ক বিশ্লেষক মামুন আবু আমের আল জাজিরাকে বলেন, এই হুমকিগুলো আসলে ‘ধোঁয়াশা তৈরি’ করার কৌশল, যার লক্ষ্য মধ্যস্থতাকারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং অক্টোবরের নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান মজবুত করা। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ আবার শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শান্তি উদ্যোগ ধসে পড়বে—যা ইরানকে ঘিরে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয় করতে গিয়ে নেতানিয়াহুর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।
এর পাশাপাশি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বহু ফ্রন্টে যুদ্ধ চালাতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সাবেক সামরিক অপারেশন প্রধান ইসরায়েল জিভের উদ্ধৃতি দিয়ে আবু আমের জানান, ২০২৬ সালে রিজার্ভ সেনারা গড়ে বছরে ৮০ দিন করে দায়িত্ব পালন করছেন। দক্ষিণ লেবাননের সংকট এখনো ‘উন্মুক্ত ক্ষত’ হয়ে আছে। এই পরিস্থিতিতে গাজায় নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা ইসরায়েলের জন্য এক দুঃস্বপ্নের মতো কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি করবে।