সৌদি আরব তেহরানকে জানিয়েছে, তারা ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে। তবে তাদের ভূখণ্ড ও জ্বালানি খাতের ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে রিয়াদও পাল্টা জবাব দিতে বাধ্য হবে। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত চারটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।
শনিবার এই বার্তা ইরানের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর, এক ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে তেহরানের কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমা চান। ইরানের হামলায় বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আঞ্চলিক ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা হিসেবে এই ক্ষমাপ্রার্থনাকে দেখা হচ্ছে।
এর দুই দিন আগে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে কথা বলেন এবং রিয়াদের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। তাদের ভাষ্য, উত্তেজনা প্রশমন এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের লক্ষ্যে যেকোনো ধরনের মধ্যস্থতার জন্য সৌদি আরব প্রস্তুত। মন্ত্রী আরও বলেন, রিয়াদ বা অন্য কোনো উপসাগরীয় দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর বিমান হামলা চালাতে তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেয়নি।
তবে সূত্রগুলো জানায়, প্রিন্স ফয়সাল একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন—যদি সৌদি ভূখণ্ড বা জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ইরানের হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে সৌদি আরব তাদের ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের জন্য ব্যবহারের অনুমতি দিতে বাধ্য হবে। রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চলতে থাকলে রিয়াদ পাল্টা প্রতিশোধও নেবে। সূত্রগুলোর মতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ভেঙে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হলে সৌদি আরব তেহরানে তাদের রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছে।
এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সৌদি ও ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো জবাব দেয়নি।
তবে শনিবার এক সাক্ষাৎকারে আব্বাস আরাগচি বলেন, তিনি তাঁর সৌদি সমকক্ষ এবং অন্য সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। রিয়াদ তেহরানকে আশ্বস্ত করেছে যে—তারা তাদের ভূখণ্ড, জলসীমা বা আকাশসীমা ইরানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য ব্যবহার করতে দেবে না।
এ দিকে, ইরানে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জানান, ইরানের অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর ওপর হামলা স্থগিত করার অনুমোদন দিয়েছে। তবে শর্ত রয়েছে—সেসব দেশ থেকে ইরানের ওপর হামলা এলে তেহরানও জবাব দেবে। তিনি বলেন, ‘ইরানের পদক্ষেপে যেসব প্রতিবেশী দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের কাছে আমি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চাইছি।’
তবে পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্য বাস্তবে নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় কি না, তা পরিষ্কার নয়। কারণ শনিবারও উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে নতুন হামলার খবর পাওয়া গেছে। আরেকটি বিষয় ইরানের নেতৃত্বের ভেতরে সম্ভাব্য মতপার্থক্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বিত যুদ্ধ কমান্ড খাতামুল আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টারস পরে এক বিবৃতিতে জানায়, পুরো অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘাঁটি ও স্বার্থ এখনো তাদের লক্ষ্যবস্তু থাকবে।
কমান্ড জানায়, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থকে সম্মান করে এবং এখন পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তবে অঞ্চলের স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটি ও সম্পদকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং সেগুলোর ওপর ‘শক্তিশালী ও ভারী’ হামলা চালানো হবে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, ইরান মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশীদের কাছে ‘ক্ষমা চেয়েছে এবং আত্মসমর্পণ করেছে।’ তিনি দাবি করেন, তেহরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে—তারা আর তাদের দিকে গুলি ছোড়বে না। তাঁর ভাষায়, ‘এই প্রতিশ্রুতি এসেছে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নিরলস হামলার কারণে।’
দুটি ইরানি সূত্রও নিশ্চিত করেছে যে একটি ফোনালাপ হয়েছিল। সেই ফোনালাপে রিয়াদ তেহরানকে সতর্ক করে সৌদি আরব ও পার্শ্ববর্তী উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা বন্ধ করতে বলেছিল। জবাবে ইরান জানায়, এসব হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে নয়; বরং তাদের ভূখণ্ডে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও সামরিক ঘাঁটিগুলোকেই লক্ষ্য করে করা হচ্ছে। এক ইরানি সূত্র জানায়, তেহরান পাল্টা দাবি করেছে যে—এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো বন্ধ করতে হবে এবং কিছু উপসাগরীয় দেশকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করা বন্ধ করতে হবে। ইরানের বিশ্বাস, ওই তথ্য তাদের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
আরেকটি ইরানি সূত্র জানায়, ইরানের কিছু সামরিক কমান্ডার হামলা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে চাপ দিচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোর ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান তাদের উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করেছিল। এর মধ্যে একসময়ের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবও ছিল। কিন্তু গত সপ্তাহে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ছোড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ঝড়ে সেই কূটনৈতিক উদ্যোগ কার্যত ভেঙে পড়েছে।