উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দার প্রতিবাদে ইরানে চলমান বিক্ষোভে প্রথমবারের মতো একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্যমতে, গতকাল বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) রাতে পশ্চিম ইরানের লোরেস্তান প্রদেশের কুহদাশত এলাকায় এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। গত তিন বছরের মধ্যে ইরানে এটিই সবচেয়ে বড় ধরনের গণবিক্ষোভ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, নিহত ব্যক্তির নাম আমিরহোসাম খোদায়ারি ফার্দ (২১)। তিনি ইরানের আধা সামরিক বাহিনী বাসিজের সদস্য ছিলেন। তবে বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে তিনি প্রাণ হারান বলে দাবি করা হলেও বার্তা সংস্থা রয়টার্স স্বতন্ত্রভাবে এ তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
প্রসঙ্গত, গত রোববার থেকে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি ও ইরানি মুদ্রা রিয়ালের নজিরবিহীন দরপতনের প্রতিবাদে দোকানদার এবং ব্যবসায়ীরা এই আন্দোলনের ডাক দেন। আজ বৃহস্পতিবারও দক্ষিণাঞ্চলীয় ফার্স প্রদেশের মারভদাশত এলাকায় বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে।
এ ছাড়া কেরমানশাহ, খুজেস্তান ও হামেদান প্রদেশে গতকাল ব্যাপক ধরপাকড় চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে নরওয়েভিত্তিক কুর্দি মানবাধিকার সংস্থা হেনগাও। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, শহরের বিভিন্ন রাস্তায় বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা এখন এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। দেশটির অর্থনীতি ৪০ শতাংশের বেশি মুদ্রাস্ফীতির কবলে রয়েছে। গত জুন মাসে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় পারমাণবিক ও সামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি আর্থিক সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
বিক্ষোভের মুখে ইরানের সরকার অবশ্য কিছুটা নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি জানিয়েছেন, সরকার ব্যবসায়ী ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে চায়।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বিক্ষোভকারীদের যৌক্তিক দাবি শোনার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন। অতীতে যেকোনো বিক্ষোভ দমনে ইরান কঠোর অবস্থান নিলেও এবার কিছুটা সমঝোতার সুর লক্ষ করা যাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রভাবে ২০২৫ সালে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। ডিসেম্বরে মুদ্রাস্ফীতি পৌঁছেছে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও ধর্মঘট পালন করছেন।
তবে ইরানের এই বিক্ষোভ কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত রাজনৈতিক ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। আলোচনার প্রস্তাব দিলেও সরকার যদি দ্রুত দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারে, তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।