যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনায় ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি হয়ে উঠেছে বিদেশে জব্দ হয়ে থাকা সম্পদের কিছু অংশ মুক্ত করা। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশের আলোচনায় প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের (১২০০ কোটি) একটি প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, যা প্রাথমিক কোনো সমঝোতা হলে ইরানের জন্য উন্মুক্ত হতে পারে।
ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, কয়েক দশক ধরে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংকিং সীমাবদ্ধতা এবং বিভিন্ন আইনি জটিলতার কারণে দেশটির ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সম্পদ বিদেশে আটকে রয়েছে। তবে এসব সম্পদের সবই যে কোনো চুক্তির ফলে অবমুক্ত হবে, এমন নয়। কিছু অর্থ এখনো আদালতের মামলা ও অন্যান্য আইনি বিধিনিষেধের আওতায় রয়েছে।
সম্প্রতি ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ কাতার সফর করেন। সেখানে ইরানের জব্দকৃত তহবিল মুক্তির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে বলে জানা যায়। ইরানের আলোচক দলের মিডিয়া সদস্য সাঈদ আজোরলু ২ জুন এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন, আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। তাঁর মতে, চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া গেলে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমনভাবে কিছু তহবিলে প্রবেশাধিকার পাবে, যা সহজে প্রত্যাহার করা যাবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের জন্য এই অর্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে গিয়ে পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর বিদেশি ব্যাংকগুলোতে বিপুল পরিমাণ তেল বিক্রির অর্থ জমা হতে থাকে। এসব অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে না পারায় ইরানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও অর্থনীতি চাপে পড়ে।
অর্থনীতিবিদদের ধারণা, জব্দকৃত অর্থের আংশিক ব্যবহারও ইরানের অর্থনীতিকে বড় ধরনের স্বস্তি দিতে পারে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়বে, মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা আসবে এবং সরকার অবকাঠামো উন্নয়ন, আমদানি ব্যয় ও অন্যান্য আর্থিক দায় মেটাতে সক্ষম হবে।
বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটিতে জমে থাকা প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার ২০২৩ সালে কাতারে স্থানান্তর করা হলেও সেই অর্থ এখনো নানা শর্তের কারণে তেহরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে।
অন্যদিকে, ইরাকের কাছে প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিক্রির বিপরীতে ইরানের কয়েক বিলিয়ন ডলার পাওনা রয়েছে। বিভিন্ন অনুমান অনুযায়ী, বিধিনিষেধ শিথিল হলে ইরান ইরাকে আটকে থাকা ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থে প্রবেশাধিকার পেতে পারে।
চীন, ভারত ও জাপানেও ইরানের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। ইরানি সূত্রগুলোর দাবি, চীনে দেশটির কয়েক-দশ বিলিয়ন ডলার এবং ভারতে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ রয়েছে। জাপানে তেল বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১.৫ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সম্পদ আটকে থাকার ধারণা করা হয়।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও ইরানের সম্পদ ছড়িয়ে রয়েছে। এসব সম্পদের ওপর নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি আইনি বিরোধ, আদালতের রায় এবং অর্থপাচারবিরোধী বিধিনিষেধ প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে লুক্সেমবার্গে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ১.৬ থেকে ২ বিলিয়ন ডলার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াই চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জব্দকৃত সম্পদের সামান্য অংশও মুক্ত হলে তা ইরানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করবে, আমদানি ব্যয় মেটাতে সহায়তা করবে এবং সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সুরক্ষা দেবে। এই কারণেই তেহরান-ওয়াশিংটন আলোচনায় বিষয়টি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।