হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

ট্রাম্পের ‘খ্যাপাটে’ পররাষ্ট্রনীতি ও সর্বগ্রাসী চাওয়া ভেস্তে দিতে পারে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের সঙ্গে নতুন আলোচনায় বসতে যাচ্ছে কঠোর ও সর্বোচ্চ দাবির এক তালিকা নিয়ে। তবে এই আলোচনার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক কৌশল কী, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আল জাজিরাকে এসব কথা বলেছেন বিশ্লেষকেরা।

আজ শুক্রবার ওমানের রাজধানী মাসকাটে যে আলোচনা হতে যাচ্ছে, সেটি গত বছরের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পর প্রথম বৈঠক। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের এটি আরেকটি অধ্যায়। শুরুতে ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন চুক্তি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধ এবং এরপর মার্কিন হামলার কারণে সেই আলোচনা ভেঙে পড়ে।

গত বছরের ডিসেম্বরে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু মানুষ নিহত হয়। একই সময়ে ট্রাম্প বারবার আরও মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দেন এবং ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জোরদার করেন। এরপর ইরানের উপকূলে বিপুল মার্কিন সামরিক শক্তি মোতায়েন করেন ট্রাম্প।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি আগেও অনুসরণ করা একধরনের কৌশল। এর আগেই ইরানে হামলা এবং ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলা মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক করার আগে একই ধরনের সামরিক প্রস্তুতি দেখা গিয়েছিল। জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়ন বিভাগের পরিচালক সিনা আজোদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, ইরান এখন দুর্বল অবস্থায় আছে। তাই তারা মনে করছে, এখনই সর্বোচ্চ দাবি তোলার সেরা সময়। এতে তারা যত বেশি সম্ভব ছাড় আদায় করতে চায়।

এই দাবিগুলোর মধ্যে শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা নয়; এর পাশাপাশি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং আঞ্চলিক যেসব গোষ্ঠীকে যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রক্সি’ বলে, তাদের প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধ করার বিষয়ও রয়েছে। মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের এই বিস্তৃত অ্যাজেন্ডার কারণে আলোচনা বারবার ভেস্তে যাওয়ার মুখে পড়েছে। এই বৈঠকে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, যদি এই আলোচনা সত্যিই অর্থবহ কোনো অবস্থানে পৌঁছাতে চায়, তাহলে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, তাদের সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে সহায়তা এবং নিজেদের জনগণের সঙ্গে আচরণের বিষয়গুলো আলোচনায় থাকতে হবে।

একই দিনে এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আবারও ইরানকে হুমকি দেন। তিনি বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ‘খুব চিন্তিত থাকা উচিত।’ তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প সম্প্রতি আলোচনার লক্ষ্য কিছুটা সীমিত বলেও ইঙ্গিত দেন। গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানের কাছ থেকে ‘দুটি জিনিস’ চান। প্রথমত, কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নয়। দ্বিতীয়ত, বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করতে হবে।

বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট আবারও হুমকি দেন। তিনি বলেন, আলোচনা চললেও ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে মনে রাখা উচিত, কূটনীতির বাইরে প্রেসিডেন্টের হাতে আরও অনেক বিকল্প আছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে উল্লেখ করেন।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি অনিশ্চিত ও খামখেয়ালি। কেউ কেউ এটিকে ‘ম্যাডম্যান থিওরি’ বা ‘খ্যাপাটে তত্ত্ব’ বলেছেন, কেউ আবার এলোমেলো সিদ্ধান্তের নীতি হিসেবে দেখছেন। এই অনিশ্চয়তা শুক্রবারের আলোচনাতেও ছায়া ফেলেছে। কারণ, গত বছরের ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালায়। তার আগে ওমানে পাঁচ দফা আলোচনা হয়। সে সময় উইটকফ সরাসরি আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করেন। ট্রাম্প ইরানকে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ বন্ধের জন্য দুই মাস সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও আরও আলোচনা নির্ধারিত ছিল। তবু যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায়।

তেহরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক। ২০১৫ সালে জেসিপিওএ চুক্তির আওতায় ইরান সমৃদ্ধকরণ সীমিত করতে রাজি হয়েছিল। এর বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের কথা ছিল। কিন্তু ট্রাম্প ২০১৮ সালে সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নেন।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য শুধু পারমাণবিক ইস্যুতে সীমিত থাকবে কি না, তা পরিষ্কার নয়। ট্রাম্প যা বলছেন, তা এক রকম। আবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও যেভাবে পুরো আত্মসমর্পণের মতো দাবি তুলছেন, সেটি আরেক রকম। ভায়েজ বলেন, অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, যুক্তরাষ্ট্র কোনো সুস্পষ্ট আলোচনা কৌশল ছাড়াই আলোচনায় যাবে। ইরান কী দিতে রাজি হয়, তার ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য বদলাতে থাকবে।

ভায়েজের মতে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্প এই আলোচনাকে সামরিক চাপ ও বিক্ষোভে সমর্থনের হুমকি থেকে বের হওয়ার একটি পথ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। তিনি বলেন, ইরানে বিক্ষোভ এখন অনেকটা দমন করা হয়েছে। নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট নয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটও তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রেও পড়বে।

তবে ট্রাম্পের আশপাশে এমন অনেক কর্মকর্তা আছেন, যেমন রুবিও, যাঁরা যেকোনো ছাড়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন। কারণ, প্রশাসনের একটি অংশ মনে করে, ইরান এখন দুর্বল। ভায়েজ বলেন, ওয়াশিংটনে অনেকের চোখে এমন কোনো চুক্তি, যা ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে সুবিধা দেবে, সেটিকে পতনের মুখে থাকা একটি সরকারকে বাঁচিয়ে দেওয়ার মতো মনে হতে পারে। আর সেটি আকর্ষণীয় নয়।

যদি প্রশাসন কঠোর অবস্থান ধরে রাখে, বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে, তাহলে খুব বেশি সহযোগিতা পাওয়া যাবে না। যদিও ইরান আরও সামরিক সংঘাত এড়াতে চায়। এ কথা বলেন জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আজোদি। তিনি বলেন, তেহরান হয়তো ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা নিয়ে কিছু সীমা নির্ধারণে রাজি হতে পারে। কিন্তু মজুত কমানোর মতো কঠোর শর্ত তারা মানবে না।

আজোদি বলেন, এই মুহূর্তে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং একমাত্র প্রতিরোধক্ষমতা হলো তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি। এটি যদি দুর্বল করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ইসরায়েলের হামলার মুখে ইরান খুবই অরক্ষিত হয়ে পড়বে। এতে দেশটি কার্যত তার সার্বভৌমত্ব হারাবে। তিনি বলেন, এটিই তাদের সবচেয়ে বড় বিপৎসীমা।

ওমানের আলোচনায়ই যুক্তরাষ্ট্রকে শান্ত করতে চায় ইরান

এখনই ইরান ছাড়ুন—নাগরিকদের উদ্দেশে মার্কিন দূতাবাসের জরুরি সতর্কতা

ট্রাম্পের বন্ধুর বিমানে করে ফিলিস্তিনিদের বহিষ্কার করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে

গাজা–পশ্চিম তীরে চোরাচালানের অভিযোগে ইসরায়েলি গোয়েন্দাপ্রধানের ভাই গ্রেপ্তার

যৌথভাবে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’ উৎপাদন করবে সৌদি–তুরস্ক

এপস্টেইন ফাইলস: ইসরায়েলে আরও ১০ লাখ রুশ পাঠাতে পুতিনের কাছে আবদার করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনার কাঠামো প্রস্তাব মধ্যস্থতাকারীদের, কী আছে এতে

গাজায় আরও ১৮ জনকে হত্যা করল ইসরায়েল, বন্ধ রাফাহ ক্রসিং

‘আলোচনার মধ্যেই’ ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করল মার্কিন যুদ্ধবিমান

ইরানে বিক্ষোভে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৩৯ বিদেশি গ্রেপ্তার