যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কংগ্রেসম্যান রো খান্না অভিযোগ করেছেন, ফিলিস্তিন সফরের সময় তিনি ও তাঁর সফরসঙ্গীদের ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা (সেটলার) রাইফেলের মুখে আটক করেছিলেন। তাঁর দাবি, ঘটনাস্থলে পৌঁছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী (আইডিএফ) তাঁদের মুক্ত করার পরিবর্তে সেটলারদের পক্ষ নিয়েছিল।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে—গতকাল শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে খান্না বলেন, ‘যখন (ইসরায়েলি সেনাবাহিনী) সেখানে পৌঁছায়, তখন তারা বসতি স্থাপনকারীদের পক্ষ নেয় এবং আমাদের আটকে রাখা অব্যাহত রাখে।’ তিনি জানান, পুরো ঘটনার বিস্তারিত শিগগিরই প্রকাশ করবেন।
এই ঘটনা অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক নজর তৈরি করেছে। প্রায় তিন বছর আগে গাজায় ইসরায়েলের শুরু করা গণহত্যামূলক যুদ্ধের পর থেকে পশ্চিম তীরে এ ধরনের সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ইসরায়েলি সরকারের সমর্থন পাওয়ায় বসতি স্থাপনকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অভিযোগ করেছে, পশ্চিম তীরে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমর্থনে জাতিগত নির্মূল (এথনিক ক্লিনজিং) অভিযান চালানো হচ্ছে। গত মাসে কয়েকটি পশ্চিমা দেশ বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নেটওয়ার্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন রো খান্না। তিনি এই ঘটনার পর সতর্ক করে বলেন, ইসরায়েলিরা ‘একটি বড় ভুল’ করেছে। গত বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খান্না জানান, ঘটনার আগের দিন ‘মেশিনগানধারী কিছু দুষ্কৃতকারী’ তাঁর সফরদলকে আটক করেছিল।
তিনি বলেন, ‘তারা রাস্তা বন্ধ করে দেয়। এরপর তারা (ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে) ডাকে এবং (ইসরায়েলি সেনাবাহিনী) এসে তাদের পক্ষ নেয়।’ খান্না আরও জানান, ওই বসতি স্থাপনকারীদের হাতে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি অ্যাসল্ট রাইফেল ছিল। ডিআরএম নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও ইসরায়েলে তাঁর সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা ছিল এমন প্রথম ঘটনা, যখন তিনি ‘সত্যিকার অর্থে গভীরভাবে অনুভব করেছেন যে তিনি একজন বাদামি বর্ণের মানুষ।’
তিনি বলেন, ‘আমি ওই বসতি স্থাপনকারীদের চোখে অহংকার দেখেছি। ২১ ও ২২ বছর বয়সী তরুণরা হাতে বন্দুক নিয়ে হাসছিল, কারণ তারা আমাদের আটক করেছিল। আমার করের অর্থে অর্থায়ন করা ওই তরুণ (ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর) সদস্যদের চোখেও একই ধরনের ঔদ্ধত্য ছিল। তারা যে মার্কিন নাগরিকদের আটক করে রেখেছিল, সেই বিষয়েও তাদের কোনো শ্রদ্ধাবোধ ছিল না।’
রো খান্নার সহকারী এবং সফরসঙ্গী ক্যামেরন কাস্কি জানান, তাঁদের এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আটকে রাখা হয়েছিল। এ সময় তাঁরা জেরুজালেমে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের কাছে সহায়তা চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, পরে পুলিশ সদস্য বলে মনে হওয়া কিছু কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে হস্তক্ষেপ করলে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়।
তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছে। তাদের দাবি, খিরবেত জানুতা এলাকার কাছে বসতি স্থাপনকারীরা গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে বলে খবর পাওয়ার পর সেনা ও পুলিশ সদস্যরা সেখানে হস্তক্ষেপ করেন। খিরবেত জানুতা একটি ছোট ফিলিস্তিনি জনপদ, যার বাসিন্দাদের ২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরুর সময় সহিংস বসতি স্থাপনকারী হামলার কারণে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা হয়েছিল।
দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের দ্বিদলীয় সমর্থন পেয়ে আসছে ইসরায়েল। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটি বাড়তি সমালোচনার মুখে পড়েছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের আইনপ্রণেতারাই ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছেন।
বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেস নতুন সামরিক ব্যয়সংক্রান্ত একটি বিল পর্যালোচনা করছে। বিলটি পাস হলে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর হবে। রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান টমাস ম্যাসি এবং রো খান্না কংগ্রেসে ইসরায়েলের প্রতি সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবিতে সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
গত সপ্তাহে খান্না জানান, প্রতিনিধি পরিষদের রুলস কমিটি টমাস ম্যাসি প্রস্তাবিত একটি বিলের ওপর ভোটাভুটি বাতিল করেছে। ওই বিলের সহ-উদ্যোক্তা ছিলেন খান্না নিজেও। বিলটিতে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছিল।