মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখবে। বিপরীতে ইরানও জবাব দিয়ে বলেছে, মার্কিন অবরোধের প্রতিক্রিয়া ‘কার্যকর এবং নজিরবিহীন পদক্ষেপের’ মাধ্যমে দেখানো হবে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
গতকাল বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, তিনি ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিতে চান না। এর মাধ্যমে তিনি কার্যত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করলেন, যা মূলত মার্কিন-ইরান আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার একটি পথ হতে পারত।
ইরান সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘বোমাবর্ষণের চেয়ে এই অবরোধ কিছুটা বেশি কার্যকর। তারা এখন দমবন্ধ করা পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে এবং তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে যাচ্ছে। তারা কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র হাতে পেতে পারে না।’
অন্যদিকে, আলোচনায় ফেরার পূর্বশর্ত হিসেবে এই অবরোধ বা ‘অবরোধের অবসান’ দাবি করেছে ইরান। বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান চলতি সপ্তাহে একটি সীমিত চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিল। যেখানে বলা হয়েছিল—ইরান হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের অবরোধ তুলে নেবে, যদি বিনিময়ে তাদের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়।
গতকাল ট্রাম্পের মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে তিনি ইরানের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জোর দিয়ে বলছেন, ইরানের সঙ্গে বর্তমান এই স্থিতাবস্থায় তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। এটি ইঙ্গিত দেয় যে তিনি কোনো পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছাতে বা পুনরায় সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে খুব একটা তাড়াহুড়ো করছেন না।
অবরোধের অংশ হিসেবে ইরান সংশ্লিষ্ট অন্তত দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনী সোমবার জানিয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহে তারা এই অঞ্চলের জলসীমায় ৩৯টি জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছে। ইরানও এর জবাব হিসেবে সমুদ্রসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে বেশ কিছু জাহাজ জব্দ করেছে।
এই অচলাবস্থার কারণে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি মুদ্রাস্ফীতিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। সেখানে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম ৪ দশমিক ২২ ডলার (লিটার প্রতি ১ দশমিক ১১ ডলার) ছাড়িয়ে গেছে—যা যুদ্ধ শুরুর আগে ৩ ডলারের (লিটারপ্রতি দশমিক ৭৯ ডলার) নিচে ছিল। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বাগযুদ্ধ তীব্র হওয়ার পর বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার তেলের দাম লাফিয়ে বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৯ ডলারের বেশি হয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ গতকাল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে ‘অর্থনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজন’ সক্রিয় করার চেষ্টা করছে যাতে ‘আমাদের ভেতর থেকে দুর্বল বা ধসিয়ে দেওয়া যায়’। তিনি অঙ্গীকার করেন যে ইরানিরা ‘শত্রুর এই প্রতারণামূলক পরিকল্পনা নস্যাৎ করবে" এবং যুদ্ধে ‘এক উজ্জ্বল বিজয় অর্জন করবে’।
এদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রেস টিভিকে এক ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, এই অবরোধের প্রতিক্রিয়ায় শিগগিরই ‘কার্যকর এবং নজিরবিহীন পদক্ষেপ’ নেওয়া হবে।
গতকাল ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তিনি বলেন, ‘তাদের কাছে খুব সামান্যই অবশিষ্ট আছে। তাদের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র আছে, যা মূল সক্ষমতার মাত্র ক্ষুদ্র একটি অংশ।’
উপসাগরীয় অঞ্চলে এই পাল্টাপাল্টি অবরোধের বাইরেও, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান পারমাণবিক ইস্যুতেও এক অচলাবস্থায় রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার কথা অস্বীকার করেছে, তবে অভ্যন্তরীণভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকারের ওপর তারা অনড়। অন্যদিকে, ট্রাম্প দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে চান।
ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন সীমিত করতে অথবা হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন বন্ধ করতেও অস্বীকার করেছে—যা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দাবি।