গাজার মাত্র ১৮ মাস বয়সী এক শিশুর গা সিগারেটের আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে দখলদার ইসরায়েলি সেনারা। একসঙ্গে শিশুটির পায়েও পেরেকে মতো ধারালো কিছু দিয়ে নির্মমভাবে জখম করে দিয়েছে তারা।
ফিলিস্তিনি সম্প্রচারমাধ্যাম প্যালেস্টাইন টিভির বরাতে এই তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজার মধ্যাঞ্চলে ১৮ মাস বয়সী এক শিশুকে নির্যাতন করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। তাদের উদ্দেশ্য ছিল শিশুটির বাবাকে জবরদস্তিমূলক স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা।
প্রতিবেদন অনুসারে, কারিম নামের ওই শিশুটিকে তার বাবা ওসামা আবু নাসেরসহ আল-মাগাজি শরণার্থী শিবিরের কাছ থেকে আটক করা হয়। সম্প্রচারিত ফুটেজে শিশুটির শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা সংবাদমাধ্যমটিকে জানিয়েছেন, আবু নাসের তাঁর জীবিকার উৎস একটি ঘোড়ার সাম্প্রতিক মৃত্যুতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। ছোট ছেলেকে নিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে যাওয়ার সময় নিজের বাড়ির কাছেই তিনি ইসরায়েলি গুলির মুখে পড়েন। অভিযোগ উঠেছে, সেনারা তাঁকে ১৮ মাস বয়সী শিশুটিকে মাটিতে রেখে একটি সামরিক চেকপয়েন্টের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়, যেখানে তাঁকে বিবস্ত্র করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদের সময় বাবার উপস্থিতিতেই শিশুটিকে নির্যাতন করে ইসরায়েলি বাহিনী। একটি চিকিৎসা মূল্যায়নে শিশুটির পায়ে সিগারেটের ছ্যাঁকা, ফুটো হয়ে যাওয়া ক্ষত এবং কোনো পেরেক বা ধারালো বস্তু বিঁধিয়ে দেওয়ার মতো জখম নিশ্চিত করা হয়েছে।
কারিমকে প্রায় ১০ ঘণ্টা পর মুক্তি দেওয়া হয় এবং আল-মাগাজিতে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির মাধ্যমে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তবে তাঁর বাবা এখনো ইসরায়েলি হেফাজতে রয়েছেন। কারিমের আত্মীয়স্বজনরা তার বাবার মুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপের আবেদন জানিয়েছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন যে তার জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রয়োজন।
মার্কিন মুসলিম অধিকার সংগঠন কাউন্সিল ফর আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর) এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে এক ‘ভয়াবহ নৈতিক অবমাননা যা কংগ্রেসের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ দাবি করে’ বলে অভিহিত করেছে।
সংগঠনটি বলেছে, ‘বিশ্বের কোথাও কোনো শিশু যেন এমন নিষ্ঠুরতার শিকার না হয়, বিশেষ করে আমেরিকান করদাতাদের অর্থে। এই কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন এবং মৌলিক মানবিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন।’ তারা আরও যোগ করেছে, ‘আমাদের রাষ্ট্রকে অবশ্যই এই অপরাধে অংশীদারিত্ব বন্ধ করতে হবে। আমেরিকান করদাতাদের অর্থ যাতে আরও শিশু নির্যাতন বা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কংগ্রেসের। বিবেকবান প্রত্যেক আইনপ্রণেতাকে এই লাগামহীন ইসরায়েলি শাসনের সামরিক সহায়তা বন্ধে ভোট দিতে হবে।’
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এই ঘটনার সংবাদ শেয়ার করে এক্সে লিখেছেন, ‘ইরান মানবতার জন্য লড়ছে। বিশ্ব হয় গাজার পাশে এবং এই ঔপনিবেশিক সন্ত্রাসী শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, নয়তো তারা এপস্টাইন শ্রেণি এবং শিশু নির্যাতনকারীদের পক্ষে থাকবে। এখানে কোনো মাঝামাঝি পথ নেই।’
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর থেকে গাজা জুড়ে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৬৭৭ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও ১ হাজার ৮১৩ জন আহত হয়েছেন।
এই যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ইসরায়েলের দুই বছরের সামরিক অভিযানের অবসান ঘটেছিল, যা ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়ার পর থেকে ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এবং ১ লাখ ৭২ হাজারের বেশি মানুষকে আহত করেছে। ইসরায়েলি হামলায় ওই অঞ্চলের প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।