ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর চলমান মামলার সাক্ষ্য গ্রহণে আজ বুধবার নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অধিকৃত জেরুজালেমের একটি জেলা আদালতে শুনানির মধ্যেই নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আলোচনার অজুহাতে আদালতের এজলাস ত্যাগ করেন তিনি। এর আগে শুনানি পিছিয়ে দেওয়ার তাঁর আবেদন আদালত নাকচ করে দেন।
সকালবেলার শুনানির শুরুতেই নেতানিয়াহু বিচারকদের জানান, তিনি দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিরতি চেয়েছিলেন, কিন্তু তা গ্রহণ করা হয়নি। তবে সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে তাঁকে কিরিয়ায় যেতে হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বৈঠকে অংশ নেওয়ার জন্য। তিনি বলেন, এই বৈঠক কতক্ষণ চলবে তা নিশ্চিত নন।
এ সময় আদালতের বিচারক রিভকা ফ্রিডম্যান-ফেল্ডম্যান সংক্ষেপে বলেন, ‘ঠিক আছে।’ এর কিছুক্ষণ পরই নেতানিয়াহু আদালতের কক্ষ ত্যাগ করেন।
এর আগে গতকাল মঙ্গলবার রাতে নেতানিয়াহুর আইনি দল আদালতের কাছে বুধবারের সাক্ষ্য গ্রহণ বিলম্বিত করার আবেদন করে। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাসূচির কথা উল্লেখ করে তারা শুনানি দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সীমিত রাখার প্রস্তাব দেয়। নেতানিয়াহুর আইনজীবী আমিত হাদাদ দাখিল করা আবেদনে ‘নিরাপত্তাজনিত কারণের’ উল্লেখ করা হয়। এই বিষয়ে বিস্তারিত সিলমোহর করা খামে আদালত ও প্রসিকিউশনের কাছে জমা দেওয়া হয়।
তবে বিচারক ফ্রিডম্যান-ফেল্ডম্যান, বিচারক মোশে বার-আম ও ওদেদ শাহামের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ আবেদনটি নাকচ করে দেন। রায়ে বলা হয়, আবেদন ও গোপন নথি পর্যালোচনার পর শুনানির সময়সূচি পরিবর্তনের পক্ষে পর্যাপ্ত ভিত্তি পাওয়া যায়নি। ফলে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শুনানি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে বাস্তবে নেতানিয়াহুর আদালত ত্যাগের কারণে সকালের শুনানি বিঘ্নিত হয়। বিরতির আগে বিচারক ও প্রসিকিউশন ইঙ্গিত দেয়, ‘কেস-৪০০০’ বেজেক ওয়াল্লা-কাণ্ড মামলায় নেতানিয়াহুর জেরা পর্ব শেষের দিকে এগোচ্ছে। আদালতে মামলা-৪০০০-এর শুনানি কবে শেষ হবে, তা নিয়ে প্রসিকিউশনের কাছে সরাসরি জানতে চান বিচারক মোশে বার-আম।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ইয়েহুদিক তিরোশকে বিচারক প্রশ্ন করেন, তিনি আজ বুধবারের মধ্যে মামলাটি শেষ করতে পারবেন কি না? জবাবে তিরোশ বলেন, আগের দিনের শুনানি মাত্র চার ঘণ্টা হয়েছিল। তিনি আশা করছেন, আগামী সোম বা মঙ্গলবারের মধ্যে জেরা শেষ করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, বিচারকের মতো তিনিও দ্রুত শুনানি শেষ করতে আগ্রহী।
এরপর নেতানিয়াহুকে জেরা চালিয়ে যান তিরোশ। তিনি অভিযোগ তোলেন, সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক শলোমো ফিলবার এমনভাবে কাজ করেছিলেন, যা ব্যবসায়ী শাউল ইলোভোভিচের স্বার্থ রক্ষা করে। ইলোভোভিচ তখন ইসরায়েলি টেলিযোগাযোগ কোম্পানি বেজেকের নিয়ন্ত্রক শেয়ারহোল্ডার ছিলেন।
জেরার সময় বেজেকের ল্যান্ডলাইন সেবা, প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো ব্যবহারের শর্ত এবং বেজেক ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কাঠামোগত পৃথকীকরণ বাতিলের মতো বিষয়গুলো উঠে আসে। তিরোশের দাবি—ফিলবার একাধিক ক্ষেত্রে বেজেকের পক্ষে কাজ করেন। তিনি সংস্কার বিলম্বিত করেন, সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার বদলে সমঝোতার চেষ্টা করেন এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের না জানিয়ে খসড়া নথি বেজেকের কাছে পাঠান।
তিরোশ বলেন, এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল নেতানিয়াহুর নির্দেশনায়। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ইলোভোভিচকে সুবিধা দিতে এবং মূল্য কমানোর চাপ কমাতে বলেছিলেন। সেই সময় বেজেকের অবস্থা নাজুক ছিল বলেও উল্লেখ করা হয়।
তবে এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, ‘আমি ফিলবারকে কিছুই বলিনি। এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কোনো কথা হয়নি।’ তিনি উল্টো অভিযোগ করেন, তদন্তকারীরা ফিলবারের জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে, তাঁর ঘনিষ্ঠদের ওপর স্পাইওয়্যার ব্যবহার করেছেন এবং একটি বৈঠকের তারিখ বানিয়ে বলেছেন, যা কখনোই হয়নি। তিনি বলেন, টেলিফোন আলাপের বিষয়েও তাঁর সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি।
দুই মাস বিরতির পর এই সপ্তাহে আজ আবার আদালতে সাক্ষ্য দেন নেতানিয়াহু। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও ইরান-সংক্রান্ত উত্তেজনার কারণে এই বিরতি হয়েছিল। মঙ্গলবারের শুনানি সংক্ষিপ্ত হলেও কেস-৪০০০-এ জেরা পুনরায় শুরু হয়। এটি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে থাকা তিনটি মামলার মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর। কারণ, এতে ঘুষের অভিযোগ রয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে নেতানিয়াহু বেজেককে সুবিধা দেন। এর বিনিময়ে এলভোভিচের মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম ওয়াল্লা নেতানিয়াহু ও তাঁর পরিবারের পক্ষে ইতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তবে নেতানিয়াহু এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
২০২০ সালে শুরু হওয়া এই বিচার এখন রাষ্ট্রপক্ষের জেরার পর্যায়ে রয়েছে। ২০১৯ সালে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে তিনি আদালতে সাক্ষ্য দিচ্ছেন। ২০২৫ সালের জুনে তাঁর জেরা শুরু হয়।
অভিযোগপত্রে তিনটি মামলা রয়েছে। কেস-১০০০-এ ধনী ব্যবসায়ী আরনন মিলখান ও জেমস প্যাকারের কাছ থেকে দামি উপহার নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কেস-২০০০-এ প্রকাশক আরনন মোজেসের সঙ্গে ইতিবাচক সংবাদ প্রকাশের বিনিময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী পত্রিকাকে দুর্বল করার আলোচনা উঠে এসেছে। আর কেস-৪০০০-এ রয়েছে বেজেক-ওয়াল্লা সংশ্লিষ্ট অভিযোগ। কেস-১০০০ ও ২০০০-এ জালিয়াতি ও বিশ্বাসভঙ্গ এবং কেস-৪০০০-এ ঘুষ, জালিয়াতি ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে।