ইরানে চলমান যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকট সাধারণ মানুষের জীবনে বহুমাত্রিক চাপ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে দেশটির কর্মসংস্থান আরও সংকুচিত হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতা মানুষের আয়ের পথ বন্ধ করে দিচ্ছে। ফলে অনেকের জীবন এখন ‘শূন্য আয়’-এর বাস্তবতায় আটকে গেছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ন্যাশনাল’ জানায়, সম্প্রতি ইরানের বৃহৎ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ‘ডিজিকালা’ থেকে কর্মী ছাঁটাইয়ের খবর পরিস্থিতির গভীরতাকে সামনে নিয়ে আসে। শুরুতে ২ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের গুজব ছড়ালেও প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মাসউদ তাবাতাবাই জানিয়েছেন, প্রকৃত সংখ্যাটি ২০০, যা মোট কর্মীর প্রায় ৩ শতাংশ। তিনি এই সিদ্ধান্তকে ‘অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিশেষ পরিস্থিতির’ ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তবে এই ঘটনা দেখাচ্ছে, একসময় সফল হিসেবে বিবেচিত কোম্পানিগুলোও এখন চাপের মুখে আছে।
ইরানের শ্রম উপমন্ত্রী গোলাম হোসেইন মোহাম্মাদি জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ১০ লাখ মানুষ সরাসরি চাকরি হারিয়েছেন এবং আরও ২০ লাখ মানুষ পরোক্ষভাবে কাজ হারিয়েছেন। প্রায় ৯ কোটি মানুষের এই দেশে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি বছর ইরানের অর্থনীতি ৬.১ শতাংশ সংকুচিত হবে এবং মূল্যস্ফীতি প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলা ইরানের আগে থেকেই দুর্বল অর্থনীতিকে আরও বিপর্যস্ত করেছে। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। দেশটির সরকারি তথ্যমতে, যুদ্ধজনিত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বড় কোম্পানিগুলোতে ছাঁটাই বাড়ছে এবং ছোট ব্যবসাগুলো টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। খাদ্য ও ওষুধের মতো প্রয়োজনীয় খাত কিছুটা টিকে থাকলেও পোশাক, ইলেকট্রনিকস ও গৃহস্থালি পণ্যের ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘কয়েক মাস ধরে কাজ নেই, দোকান বন্ধ, ব্যবসায় কোনো লেনদেন নেই।’
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি। দক্ষিণ ইরানের এক নারী জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের তুলনায় খাদ্যপণ্যের দাম ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে এক কেজি মুরগির বুকের মাংসের দাম প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার তুমান (প্রায় ৬৮৭ টাকা), যেখানে মাসিক ন্যূনতম মজুরি মাত্র ১৩ হাজার টাকার সমপরিমাণ।
‘জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি’ সতর্ক করেছে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ইরানের দারিদ্র্যের হার ৪১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। দেশটির ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধকালীন ব্ল্যাকআউটের ফলে অনলাইন ব্যবসা প্রায় অচল হয়ে গেছে। নেটব্লকস জানিয়েছে, এই ইন্টারনেট বন্ধের কারণে ইরানের অর্থনীতিতে অন্তত ১.৮ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। ইরানে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ ইনস্টাগ্রামভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু এখন ক্রেতারা অনলাইনে প্রবেশ করতে না পারায় এই খাত প্রায় স্থবির হয়ে গেছে।
রাজধানী তেহরানের এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, তাঁর আত্মীয়ের অনলাইন ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আগে তিনি (আত্মীয়) খুব আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু এখন তাঁর আয় শূন্য।’
অন্যদিকে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অবরোধ পরিস্থিতিও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এখনো তেলের আয়ে বড় প্রভাব না পড়লেও কয়েক মাসের মধ্যে তা স্পষ্ট হতে পারে। প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংকট বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সব মিলিয়ে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং ডিজিটাল সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত প্রভাবে সাধারণ ইরানিদের জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। অনেকে এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন—কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তার কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই।