ইয়েমেনে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে (এসটিসি) লক্ষ্য করে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। আজ শুক্রবার (২ জানুয়ারি) পূর্ব ইয়েমেনের হাজরামাউত প্রদেশে এই হামলায় অন্তত সাতজন বিচ্ছিন্নতাবাদী যোদ্ধা নিহত এবং ২০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মাসে এসটিসি এই অঞ্চলটি দখলের পর সৌদি জোটের পক্ষ থেকে এটিই প্রথম সরাসরি প্রাণঘাতী হামলা। এর আগে সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী হাজরামাউতের সামরিক স্থাপনাগুলো ‘শান্তিপূর্ণভাবে’ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। কিন্তু ওই ঘোষণা দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিমান হামলা শুরু হয়।
ওয়াদি হাজরামাউত ও হাজরামাউত মরুভূমি অঞ্চলে এসটিসির প্রধান মোহাম্মদ আবদুলমালিক জানান, আল-খাসাহ সামরিক ক্যাম্পে সাতটি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এতে সাতজন নিহত এবং ২০ জনের বেশি আহত হয়েছে। তিনি আরও জানান, একই অঞ্চলের অন্য স্থাপনাতেও হামলা চালানো হয়েছে।
ইয়েমেনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সাবা নেট বলছে, হাজরামাউতের গভর্নর সালেম আল-খানবাশি একে ‘শান্তিপূর্ণ অপারেশন’ এবং ‘প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এটি কোনো যুদ্ধের ঘোষণা নয়, বরং অঞ্চলটিকে বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করার একটি পদক্ষেপ।
তবে এসটিসির পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিনিধি আমর আল-বিদ এই অভিযানকে ‘প্রতারণা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছেন, সৌদি আরব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ‘শান্তিপূর্ণ অভিযানের’ নাম দিয়ে বিভ্রান্ত করছে। ‘শান্তিপূর্ণভাবে’ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তারা দফায় দফায় বিমান হামলা চালিয়েছে।
সৌদি সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, হামলাগুলো সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটই চালিয়েছে। ২০১৫ সালে ইয়েমেনের উত্তরে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য এই জোট গঠন করা হয়।
সৌদি সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ এক সূত্র সতর্ক করে বলেন, ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল দুই প্রদেশ থেকে সরে না যাওয়া পর্যন্ত এই অভিযান বন্ধ হবে না।’
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এসটিসি হঠাৎ এক অভিযানে হাজরামাউত এবং মাহরা প্রদেশের বিশাল এলাকা দখল করে নেয়। সৌদি আরব এই অঞ্চলকে নিজেদের ‘রেড লাইন’ বা চরম সীমা হিসেবে মনে করে। এই এলাকাগুলো সৌদি আরবের সীমান্তসংলগ্ন হওয়ায় রিয়াদ এখানে কোনো আমিরাতপন্থী শক্তির একাধিপত্য মানতে রাজি নয়।
অন্যদিকে হাজরামাউত ইয়েমেনের সবচেয়ে বড় এবং তেলসমৃদ্ধ প্রদেশ। এর নিয়ন্ত্রণ হারানো মানে ইয়েমেন সরকারের আয়ের মূল উৎস হারানো। ফলে এই অঞ্চল নিয়ে এখন দীর্ঘদিনের মিত্র সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে চরম কূটনৈতিক ও সামরিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। তবে ইতিমধ্যেই সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেন থেকে তাদের অবশিষ্ট সব সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে।
এদিকে, গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে ইয়েমেনের প্রধান প্রবেশপথ এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্পূর্ণ অচল হয়ে রয়েছে। সৌদি আরবের অভিযোগ, এসটিসি প্রধান আইদারুস আল-জুবাইদি সৌদি আরবের একটি প্রতিনিধিদলকে এডেনে নামার অনুমতি দেননি এবং বিমানবন্দর বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন।
তবে এসটিসির পাল্টা অভিযোগ, সৌদি আরব ইয়েমেনের আকাশপথে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। রিয়াদ নির্দেশ দিয়েছে, ইউএই-গামী সব বিমানকে বাধ্যতামূলকভাবে সৌদি আরবে যাত্রাবিরতি করে নিরাপত্তা তল্লাশির মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
ফ্লাইট রাডারের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে এডেন বিমানবন্দরে কোনো বিমান ওঠানামা করেনি। তবে বিমানবন্দর বন্ধের বিষয়ে দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি।