হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

অনাক্রমণ চুক্তি ও হুতিদের নিয়ন্ত্রণসহ তেহরানে যা আলোচিত হয়েছে ইরান–মক্কা জোটের মধ্যে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

তেহরানে মক্কা জোটভুক্ত দেশগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বরা। ছবি: এএফপি

তেহরানে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিনিধিদের বৈঠকে উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সমঝোতা হয়নি। তবে আলোচনা অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। সৌদি আরবের শহরগুলোতে হুতিদের হামলা বন্ধের বিষয়েও কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল নিউজের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

সৌদি আরব ও মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির দুই অংশীদার পাকিস্তান ও তুরস্কের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা তেহরান সফর করার এক দিন পর আঞ্চলিক সূত্রগুলো এসব তথ্য জানিয়েছে। অঞ্চলটির সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার এবং সমাধানের পথ খুঁজে বের করার অংশ হিসেবে সোমবার ইরানের রাজধানী তেহরানে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক মক্কা চুক্তির অংশীদার।

সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমানের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি ইরান সফর করে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে ক্রমবর্ধমান হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে এই সফরকে সৌদি আরবের জরুরি কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বৈঠকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থা প্রধান ইব্রাহিম কালিনও অংশ নেন। বৈঠক শেষে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে। তবে আলোচনার বিষয়ে অবহিত আঞ্চলিক সূত্রগুলোর দাবি, এতে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি।

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিনিধিরা ইরানকে তাদের সমর্থনপুষ্ট হুতিদের সৌদি আরবে হামলা বন্ধ করতে বলার অনুরোধ জানান। তবে ইরান দাবি করেছে, ইয়েমেনে তাদের মিত্রদের ওপর এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার মতো যথেষ্ট প্রভাব তাদের নেই।

এর পরিবর্তে ইরান অতিথিদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটনকে তেহরানের প্রস্তাব মেনে নিতে রাজি করানোর অনুরোধ জানায়। ইরান পুরো অঞ্চলজুড়ে দুই সপ্তাহের জন্য শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। এর বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি ধীরে ধীরে পুনরায় খুলে দেওয়ার মাধ্যমে আলোচনা আবার শুরু করার সুযোগ তৈরি হবে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। তেহরানের একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরান এ বিষয়ে ‘সহায়তা করতে প্রস্তুত।’ তবে হুতিদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাদের শর্ত হলো, লড়াই বন্ধের আগে সৌদি আরবকে ইয়েমেনের ওপর থেকে আকাশ অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে।

ইয়েমেনের আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, হুতিদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে চূড়ান্ত আলোচনা ইয়েমেনের রাজধানী সানায় অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। তেহরানের ঘনিষ্ঠ আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, শিগগিরই দ্বিতীয় দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে পারে। সূত্রটি বলেছে, তিন দেশের প্রতিনিধি দলের সফর অনুষ্ঠিত হওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাৎক্ষণিক কোনো অগ্রগতি হয়নি। বিষয়গুলো এত বড় ও জটিল যে এক দফা আলোচনায় সমাধান সম্ভব নয়।

সূত্রটি আরও জানায়, পক্ষগুলো সংলাপ ও পরামর্শ চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে। তুরস্কে দ্বিতীয় দফার বৈঠক আয়োজনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি।

হুতিদের সঙ্গে সংঘাত বন্ধে সহায়তার প্রস্তাব ইরানের

সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে লড়াই বন্ধে সহায়তা করার আগ্রহ ইরান আগেও প্রকাশ করেছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দুই পক্ষের মধ্যে সংলাপ সহজতর করতে সহায়তার প্রস্তাব দেন। তবে হুতিদের প্রধান সমর্থক হিসেবে ইরানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে হুতিদের প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য, কৌশলগত দিকনির্দেশনা এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা দিয়ে আসছে।

চলতি মাসে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতিবিরোধী জোটের গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে জানায়, ইরানের সহায়তায় হুতিরা সৌদি আরব ও ইয়েমেনে তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে এযাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিশালী ও অত্যাধুনিক হামলাগুলো চালাতে সক্ষম হয়েছে।

‘অবরোধের জবাবে অবরোধ’ নীতি হুতিদের

সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে গত জুলাইয়ে। সে সময় ইয়েমেনের রাজধানী সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালানো হয়। হুতিরা এ হামলার জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করে। তবে সৌদি আরব-সমর্থিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার হামলার দায় স্বীকার করে জানায়, অনুমতি ছাড়া একটি ইরানি বিমান যাতে অবতরণ করতে না পারে, সে জন্য রানওয়েকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল।

এরপর সৌদি আরবের আরোপ করা আকাশসীমাসংক্রান্ত বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকে হুতিরা ‘অবরোধের জবাবে অবরোধ’ নীতি ঘোষণা করে। তারা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয়।

ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর লোহিত সাগর সৌদি আরবের তেল রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ওপর চাপ যত বেড়েছে, হুতিরা তত বেশি তাদের সামরিক অভিযান জোরদার করেছে।

আঞ্চলিক অনাক্রমণ চুক্তি গঠনের উদ্যোগ

যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েল যখন সতর্ক করে দিচ্ছিল যে যেকোনো মুহূর্তে আবারও সংঘাত শুরু হতে পারে, তখন তেহরানে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আঞ্চলিক একটি সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল একটি আঞ্চলিক অনাক্রমণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ী রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেছেন, আলোচনাগুলো ‘খুব ভালো’ হয়েছে। তিনি আরও জানান, ইরান এবং মক্কা চুক্তির তিন অংশীদার দেশ একমত হয়েছে যে বাইরের শক্তির পরিবর্তে আঞ্চলিক দেশগুলোকেই নিজেদের অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি বুধবার রেজায়ীর সঙ্গে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে ইরানের শর্তগুলো পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে দ্য ন্যাশনাল জানতে পেরেছে, সৌদি আরব ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে এই আলোচনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য ইরানবিরোধী হামলা ঠেকানোর উদ্দেশ্যে আয়োজন করা হয়নি।

বরং এর লক্ষ্য ছিল, আবারও যুদ্ধ শুরু হলে কোন নীতি অনুসরণ করা হবে এবং কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি করা। এর মাধ্যমে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এর আগে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি উপসাগরীয় ছয়টি রাষ্ট্রের পাশাপাশি ইরান ও ইরাককে নিয়ে একটি অনাক্রমণভিত্তিক নিরাপত্তা চুক্তি গঠনের আহ্বান জানান। কেমব্রিজের গার্টন কলেজে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র আর নিরাপত্তার প্রধান জোগানদাতা থাকবে না।

আগের সফরের তুলনায় এবার পরিস্থিতি ভিন্ন

প্রিন্স খালিদ বিন সালমান সর্বশেষ ২০২৫ সালের এপ্রিলে তেহরান সফর করেছিলেন। সে সময় অঞ্চলটি ভিন্ন ধরনের সংঘাতের আশঙ্কায় ছিল। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনা শুরুর আগে তিনি ইরানে পৌঁছান। ওই সফরে তিনি সৌদি বাদশাহ সালমানের পক্ষ থেকে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেন। ওই সফরের যথেষ্ট প্রতীকী গুরুত্ব ছিল।

তবে এবারের সফরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত থাকার চিত্র সামনে আসে। তেহরানে বৈঠক শেষ হওয়ার পর সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেনের জোট জানায়, তারা ইরান-সমর্থিত বিদ্রোহীদের ছোড়া তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের দিকে ছোড়া হয়েছিল।

একই সময়ে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্য করে ছোড়া চারটি ড্রোনও প্রতিহত করা হয় বলে জোটটি জানায়। পরে রিয়াদের দিকে ছোড়া আরও দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথাও জানায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।

সব মিলিয়ে, তেহরানে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইরানের বৈঠকে সংলাপ অব্যাহত রাখার বিষয়ে সম্মতি মিললেও হুতিদের হামলা বন্ধ বা সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট সমঝোতা হয়নি। একই সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

ইসরায়েলে নির্বাচনে আরব দলগুলো পাচ্ছে ১৯ আসন, নেতানিয়াহু ও বিরোধীরা পাচ্ছে কত

আরব দলগুলোর উত্থানে বেশি আসন পেয়েও বেকায়দায় নেতানিয়াহুর জোট

ইহুদি সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন নেতানিয়াহুই পেলেন, হুমকি দিলেন ইরানকে

নেতানিয়াহু নাকি আইজেনকট, কে হচ্ছেন ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী

গাজা-লেবানন-সিরিয়ায় দখল বজায় রাখা, ইরানকে দুর্বল করা: নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা

নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী আইজেনকটের জয় যেভাবে ইরান যুদ্ধের গতিপথ বদলাতে পারে

পশ্চিম তীরে ৩ বছরে ১০৮০ জনকে হত্যা, ইসরায়েলের ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘ

ইরানে আকস্মিক অভিযান চালাবে যুক্তরাষ্ট্র, প্রস্তুত থাকতে বলল উপসাগরীয় দেশগুলোকে

ইসরায়েলে নির্বাচন: প্রথমবারের মতো রেকর্ডসংখ্যক আসন পেতে যাচ্ছে আরবরা

নেতানিয়াহুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই, ইসরায়েলে সরকার গঠনের চাবি আরব দলগুলোর হাতে