জর্ডান ও ইরাকে সপ্তাহান্তে মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা টানা নবম রাতের মতো ইরানে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যেই তেহরান ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি স্থল আক্রমণ চালায়, তবে সেটিকে তারা ‘স্বাগত’ জানাতে প্রস্তুত।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, দেশটির নেতৃত্ব মার্কিন বাহিনীর সম্ভাব্য যেকোনো স্থল আগ্রাসনকে ‘স্বাগত জানাতে অপেক্ষার প্রহর গুনছে।’ তিনি আরও বলেন, জুন মাসে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির পাঠ ‘সম্পূর্ণ স্পষ্ট’ এবং ওয়াশিংটনের সেই চুক্তি লঙ্ঘনের ‘কোনো অজুহাত নেই।’
গতকাল সোমবার ভোরে মার্কিন সামরিক বাহিনী এক্সে এক পোস্টে দাবি করে, তাদের হামলায় ইরানের সামরিক কমান্ড সেন্টার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র, সামুদ্রিক সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্ক লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। মার্কিন বাহিনীর দাবি, এই নতুন হামলার উদ্দেশ্য হলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের ওপর হামলা চালানোর ইরানের সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করে দেওয়া।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, সাম্প্রতিক এই ‘অত্যন্ত কঠোর’ হামলাগুলো সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নিহত তিন মার্কিন সেনাসদস্যের সম্মানে পরিচালিত হয়েছে। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আজ রাতে আমরা তাদের ওপর আবারও খুব কঠোরভাবে আঘাত হেনেছি, এবং সেটা করেছি সম্ভবত তিনজন মহান দেশপ্রেমিকের সম্মানে।’
ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান ‘অত্যন্ত, অত্যন্ত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামরিকভাবে তারা প্রায় সবকিছুই হারিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘তাদের কাছে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র, কিছু ড্রোন এবং সামান্য উৎপাদন সক্ষমতা আছে, তবে খুব বেশি নয়।’ মার্কিন সেনাদের মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা গভীরভাবে দুঃখিত।’ তিনি যোগ করেন, নিহত সেনারা লড়াই করছিলেন যাতে তেহরান ‘পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে।’
সেন্টকম জানায়, শনিবার উত্তর ইরাকে একটি ভূপাতিত ইরানি একমুখী (ওয়ান-ওয়ে) আক্রমণাত্মক ড্রোনের অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ নিয়ন্ত্রিতভাবে ধ্বংস করার সময় একজন মার্কিন সেনা নিহত হন।
এর আগে শুক্রবার জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় আরও অন্তত দুই মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হন। সোমবার মার্কিন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেন, হাওয়াইয়ের ২৫ বছর বয়সী লেফটেন্যান্ট টাইলার জেমস ফিহান এবং টেক্সাসের ১৯ বছর বয়সী প্রাইভেট ইসাবেলা গনজালেস গত ১৭ জুলাই মুয়াফফাক শালতি বিমানঘাঁটিতে ‘শত্রুপক্ষের হামলায়’ নিহত হন। সেন্টকমের ঘোষণার কিছুক্ষণ পরই ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের বন্দর মাহশাহর, বন্দর ইমাম খোমেনি ও চাবাহার এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবরিজ শহর রয়েছে।
ইরানের আধা-সরকারি মেহের নিউজ এজেন্সি জানায়, তাবরিজের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একজন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। পরে সোমবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, দক্ষিণাঞ্চলের বন্দরনগরী বুশেহরের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানো হয়েছে। শহরটিতেই ইরানের বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অবস্থিত।
বুশেহরের গভর্নর মোহাম্মদ মোজাফফারি বলেন, ‘কয়েক মিনিট আগে বুশেহর শহরের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন শত্রুর নিক্ষেপ করা প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে।’ তিনি জানান, হামলার পরিধি ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা তদন্ত করা হচ্ছে। এর আগে, গত রোববার দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নির্মাণাধীন দারখোভিন পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নিন্দা জানাতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তেহরান। ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা এই হামলাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
তেহরান এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্র জর্ডান, কুয়েত ও সিরিয়ায় ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, জর্ডানে তারা আকাবা বিমানবন্দরে অবস্থানরত মার্কিন সি-১৭ পরিবহন বিমান এবং একটি পি-৮ নজরদারি বিমান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে বিমানগুলোতে আঘাত হানা হয়েছে, যাতে বেশ কয়েকটি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ তারা আরও দাবি করে, মুয়াফফাক শালতি বিমানঘাঁটির ২০টি আশ্রয়কেন্দ্র, যেখানে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছিলেন, সেগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং এতে ডজন ডজন মার্কিন সন্ত্রাসী সেনা নিহত হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তারা নিউইয়র্ক টাইমসকে জানান, বিমানঘাঁটিতে হামলার আগে গত সপ্তাহে জর্ডানে ইরানের তিনটি হামলায় আরও বহু মার্কিন সেনা আহত হন এবং হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কুয়েতে আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা আলি আল সালেম বিমানঘাঁটিতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা, বিমান চলাচল-সংক্রান্ত সরঞ্জামের গুদাম এবং এমকিউ-৯ ড্রোন রাখার হ্যাঙ্গার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যাতে কয়েকটি বিমান আগুনে পুড়ে যায়। কুয়েত সরকার রোববার জানায়, একটি লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ (ডিস্যালিনেশন) কেন্দ্র টানা দ্বিতীয় দিনের মতো হামলার শিকার হয়েছে এবং তারা এটিকে গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর সরাসরি হামলা বলে নিন্দা জানায়।
কুয়েতি সেনাবাহিনী এক্সে জানায়, ইরানের হামলার জবাবে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। তারা নিশ্চিত করেছে, যে কোনো বিস্ফোরণের শব্দ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তু প্রতিহত করার ফল।’
একই সঙ্গে জনগণকে নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়। আইআরজিসি আরও ঘোষণা দেয় যে—তারা সিরিয়ার আল-তানফে একটি কমান্ড সেন্টারের ওপর ‘আকস্মিক হামলা’ চালিয়েছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ইরানশাহর শহরে নিহত সেনাদের ‘শহীদের রক্তের প্রতিশোধ’ হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
বাহরাইনের রাজধানী মানামায় বিস্ফোরণের খবরের মধ্যে সাইরেন বেজে ওঠে। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, ইরানের হামলা মোকাবিলায় তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে।