ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদির ওয়াশিংটন সফরের প্রায় এক সপ্তাহ বাকি আছে। তার ঠিক আগে দেশটির সশস্ত্র সংগঠন ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাকের সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠী–উপগোষ্ঠীগুলো অস্ত্র হস্তান্তর করার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে। এমনকি তাদের অনেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম আশারক আল–আওসাতের খবরে বলা হয়েছে, যখন মার্কিন প্রশাসন বাগদাদের ওপর উপদলগুলোকে নিরস্ত্র করার এবং ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য চাপ দিচ্ছে, তখন এই উপদলগুলোর সর্বশেষ অবস্থান আল-জাইদিকে জটিল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
ইরাক সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তির অধীনে দেশটির আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক উপস্থিতি অবসানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকার এর আগে অস্ত্র সমর্পণ ও নিষ্ক্রিয় করার জন্য সেপ্টেম্বরের শেষ সময়কে চূড়ান্ত সময়সীমা হিসেবে নির্ধারণ করেছিল। আল-জাইদি গত সপ্তাহে বলেছিলেন, সরকার গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসেছে। তিনি জানান, তাদের কার্যক্রম ‘পরে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে স্থানান্তরিত হবে।’
আল জাইদি বলেন, নিরস্ত্রীকরণ এবং সরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে অস্ত্র হস্তান্তরের সময়সীমা শেষ হয়ে যাওয়ার পর, ‘অস্ত্র কেবল এবং সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান এবং এর বিশেষায়িত সশস্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনীর অধীনে থাকবে।’
এদিকে, কড়া ভাষায় দেওয়া এক বিবৃতিতে কাতাইব হিজবুল্লাহর কর্মকর্তা আবু হুসেইন আল-হামিদাউই ইরাকি সরকারকে তাদের কাছে ‘নতি স্বীকার’ করার দাবি জানান। গত এপ্রিলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আল-হামিদাউইকে ধরার জন্য বা দোষী সাব্যস্ত করার তথ্য দেওয়ার জন্য ১০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পুরস্কারের ঘোষণা দেয়। তাঁকে ইরানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ উপদলীয় নেতাদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয়।
আল-হামিদাউই বলেন, কাতায়েব হিজবুল্লাহ প্রয়াত ইরানি সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির দ্বারা এবং তাঁর আদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি আরও যোগ করেন—এর সদস্যরা ‘এই পথের প্রতি অনুগত ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।’ নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনার দিকে ইঙ্গিত করে আল-হামিদাউই বলেন, ‘এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে, আমরা রাজনৈতিক নেতা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি যে তাঁরা যেন প্রতিরোধ ও জিহাদের মানুষের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করেন। সেই সঙ্গে অহংকারী প্রকল্পগুলোর মধ্যে টেনে নেওয়া বা তাদের ক্ষতিকারক এজেন্ডাগুলোর সঙ্গে নিজেদের সারিবদ্ধ করার বিরুদ্ধে চরম সতর্কতা অবলম্বন করেন।’ তিনি যোগ করেন, ‘আমরা তাঁদের সতর্ক করছি যে নাবিক যদি দিক হারায়, তবে আমাদের জনগণ তাদের অবস্থান এবং সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবে।’
ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাকও অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে। এই সশস্ত্র জোটে এমন কিছু অপ্রকাশিত উপগোষ্ঠী রয়েছে যাদের এজেন্ডা ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসের কার্যক্রমের সঙ্গে মিলে যায়। এদের ব্যাপকভাবে পরিচিত ইরান-সমর্থিত উপদলগুলোর গোপন শাখা হিসেবেও দেখা হয়।
শনিবার এক বিবৃতিতে গোষ্ঠীটি জানায়, তারা ‘প্রতিরোধের পথের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ তারা বলেছে, ‘শত্রুরা জেনে রাখুক যে সত্যের অক্ষের শক্তিগুলো একদেহ। তারা আমাদের নেতা খামেনি নির্ধারিত জিহাদি কাঠামো অনুযায়ী কাজ করে। কষ্ট আমাদের দমাতে পারবে না, বরং এটি আমাদের পথ চলা চালিয়ে যাওয়ার সংকল্পকে আরও দৃঢ় করবে। আমরা নিপীড়িতদের সমর্থন করা এবং ইরাক ও এই অঞ্চল থেকে দখলদারদের বিতাড়িত করা অব্যাহত রাখব।’
গোষ্ঠীটি আরও বলেছে, ‘আমাদের অস্ত্র কখনো দরকষাকষির বিষয় ছিল না। এটি একটি আদর্শ এবং একটি অঙ্গীকার যার জন্য আমরা দায়ী। এটি নিয়ে আমরা আধিপত্যের শৃঙ্খল ভাঙতে এবং অহংকারী শক্তিগুলোকে দমন করতে এগিয়ে যাব। তাই আমরা কাছের এবং দূরের মানুষদের আশ্বস্ত করছি যে—আমরা যা অর্জন করেছি তাতেই থেমে থাকব না। বরং আমরা আমাদের সামরিক ও নিরাপত্তা সক্ষমতার পরিমাণগত এবং গুণগত উভয় দিক থেকে উন্নয়ন করতে কাজ করব। ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ এবং হুমকির মাত্রার অনুপাতে আমাদের প্রস্তুতি আরও বাড়িয়ে তুলব।’
এখন পর্যন্ত শিয়া ধর্মীয় নেতা ও সদরিস্ট আন্দোলনের প্রধান মুক্তাদা আল-সদর সব অস্ত্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন। গত মাসে তিনি তাঁর সশস্ত্র গোষ্ঠী সারায়া আল-সালামকে তাদের অস্ত্র এবং আনুষ্ঠানিক সদরদপ্তর রাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করার নির্দেশ দেন। এ ছাড়া, আসায়েব আহল আল-হক এবং কাতায়েব ইমাম আলিও এই দাবি মেনে নিয়েছে। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, কিছু উপদলের এই পদক্ষেপের প্রতি ক্রমাগত প্রত্যাখ্যানের কারণে এই ইস্যুতে সরকারকে আরও বেশি চ্যালেঞ্জ এবং জটিলতার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
উপদলগুলোকে নিরস্ত্র করার সম্ভাবনা নিয়ে পর্যবেক্ষকেরা বিভক্ত। কেউ কেউ মনে করেন ইরানের নমনীয়তা বা স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া এটি অসম্ভব। অন্য পক্ষ বিশ্বাস করে যে দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক পরিস্থিতির মধ্যে সরকার এটি অর্জন করতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিজার হায়দার বলেন, মিলিশিয়ারা প্রকাশ্যে কী ঘোষণা করছে এবং গোপনে কী লুকাচ্ছে তার মধ্যে পার্থক্য করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, এর মধ্যে রয়েছে ‘গোপন বোঝাপড়া যা শেষ পর্যন্ত তাদের অস্ত্র সম্পূর্ণ সমর্পণ এবং তাদের সামরিক ফর্মেশনগুলো ভেঙে দেওয়ার দিকে নিয়ে যাবে।’
হায়দার বলেন, তিনি আশা করছেন—ইরাকি বিচার বিভাগ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে অস্ত্র রেখে আইন লঙ্ঘনকারী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধমূলক অবস্থান নেবে। তিনি আরও যোগ করেন যে বিচার বিভাগ ২০০৩ সালের পর প্রথমবারের মতো একটি আইনি কোড বা বিধিমালা ঘোষণা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। হায়দার বলেন, ‘রাষ্ট্রের বাইরে যেকোনো সামরিক ফর্মেশন বা সামরিক কার্যক্রমকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে গণ্য করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিদ্যমান ইরাকি আইনের অধীনে এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।’
তিনি বলেন, এই আইনি বিধান যদি জারি করা হয়, তবে তা ‘সব অস্ত্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারকে উল্লেখযোগ্যভাবে সাহায্য করবে।’ হায়দার যোগ করেন, উপদলগুলোকে নিরস্ত্র এবং ভেঙে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা ‘নিরাপত্তা ও সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সেই সব মিলিশিয়া সদস্যদের তাড়িয়ে দেওয়ার সরকারি পরিকল্পনার মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হবে, যারা তাদের নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কের অধীনে তাদের নিরাপত্তা ও সামরিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে আসতে অস্বীকার করছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যেসব উপদল এই ধরনের পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে, তাদের উদাহরণ অনুসরণ করে এই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’