গাজার মতো করে এবার দক্ষিণ লেবাননের অঞ্চল দখল করে সেখানে ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখা নামে নতুন সীমারেখা নির্ধারণ করেছে ইসরায়েল। দেশটির সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ লেবাননে তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন বা হলুদ রেখা স্থাপন করেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দক্ষিণ লেবাননে ‘ইয়েলো লাইনের দক্ষিণে পরিচালিত তাদের বাহিনী এমন কিছু সন্ত্রাসীকে শনাক্ত করেছে, যারা যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি লঙ্ঘন করেছে এবং ইয়েলো লাইনের উত্তর দিক থেকে বাহিনীর দিকে এমনভাবে অগ্রসর হয়েছে, যা তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করেছিল।’
লেবাননেও এই প্রথম ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এ ধরনের কোনো ‘ইয়েলো লাইন’–এর কথা উল্লেখ করল। গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এই ঘোষণা এল।
অক্টোবরে গাজায় তথাকথিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল ইয়েলো লাইন দিয়ে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটিকে পৃথক অঞ্চলে বিভক্ত করে। এর মধ্যে একটি পূর্ব অঞ্চল, যা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এবং একটি পশ্চিম অঞ্চল যেখানে ফিলিস্তিনিদের চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ কিছুটা কম। ইসরায়েলি সেনারা এই লাইনের দিকে অগ্রসর হওয়া যে কারও ওপর নিয়মিত গুলি চালায় এবং তারা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে শত শত ঘরবাড়ি ধ্বংস করেছে। যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৭৭৩ জন নিহত এবং ২ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লাহ থেকে আল জাজিরার নূর ওদেহ জানান, লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ইয়েলো লাইন ঘোষণার মাধ্যমে দক্ষিণ লেবাননেও ‘গাজাকরণ’ (Gazafication) প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেছিলেন, বেইত হানুন এবং রাফাহ মডেলের ওপর ভিত্তি করে সীমান্ত এলাকার লেবাননি গ্রামগুলো ধ্বংস করার জন্য সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা জানি সেখানে কী ঘটেছে কারণ সেখানে এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।’
তিনি যোগ করেন, ‘লেবাননের ক্ষেত্রে এটি হয়তো এখনই দক্ষিণ লেবাননে অধিকৃত এলাকা সম্প্রসারণের জন্য নয়। তবে অবশ্যই লেবাননি গ্রামগুলো ধ্বংস করার কাজ অব্যাহত রয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিয়া গ্রাম এবং হিজবুল্লাহর অবকাঠামোর মধ্যে একটি সমীকরণ তৈরি করেছেন, ঠিক যেভাবে তিনি গাজার ফিলিস্তিনিদের হামাসের প্রতিনিধি এবং ইসরায়েলের জন্য সমান হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।’
যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে। শনিবার ইসরায়েলি কামানের গোলা দক্ষিণ লেবাননের শহর বেইত লেইফ, কান্তারা এবং টুলিনে আঘাত হানে। একই সঙ্গে সামরিক বাহিনী বেশ কয়েকটি এলাকায় ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া অব্যাহত রেখেছে। এক বিবৃতিতে লেবানিজ সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে যেখানে ইসরায়েলি সেনারা এখনো অবস্থান করছে, সেখানে যোদ্ধারা অগ্রসর হওয়ায় এবং তারা ‘আসন্ন হুমকি’ তৈরি করায় তারা এই হামলা চালিয়েছে।
এদিকে শনিবার হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাঈম কাসেম বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি ততক্ষণ পর্যন্ত চলতে পারে না, যতক্ষণ না উভয় পক্ষ এটি মেনে চলে। টেলিভিশনে পাঠ করা এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি মানে সব ধরনের সংঘাতের পূর্ণ সমাপ্তি। যেহেতু আমরা এই শত্রুকে বিশ্বাস করি না, তাই প্রতিরোধ যোদ্ধারা তাদের হাত ট্রিগারে রেখে রণক্ষেত্রে অবস্থান করবে এবং তারা সেই অনুযায়ী লঙ্ঘনের জবাব দেবে।’
নাঈম কাসেম আরও বলেন, ‘শুধু প্রতিরোধ বাহিনীর (হিজবুল্লাহ) পক্ষ থেকে কোনো যুদ্ধবিরতি হবে না; এটি উভয় পক্ষ থেকেই হতে হবে।’ কাসেম লেবানন থেকে ইসরায়েলকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহারের দাবি জানান।