মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার ইরানের সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়েছেন। ট্রাম্পের এই ঘোষণাকে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র মধ্যে আবারও আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান। আর বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে কোনো বিভাজন নেই। তাঁরা ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও সাউথ এশিয়ান স্ট্র্যাটেজিক স্ট্যাবিলিটি ইনস্টিটিউট ইউনিভার্সিটির মহাপরিচালক মারিয়া সুলতান বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প-ঘোষিত যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। ইসলামাবাদ উভয় পক্ষকে সতর্ক করেছে—যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অর্থ হলো যুদ্ধ। তিনি বলেন, ‘যদি যুদ্ধবিরতি বাড়ানো না হতো, তাহলে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক তীব্রতা আমরা দেখতে পেতাম।’
পাকিস্তানি এই বিশ্লেষক বলেন, ‘এতে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত। কারণ, সেখানে ইতিমধ্যেই মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বেড়েছে।’ তিনি জানান, পাকিস্তান ওয়াশিংটন ও তেহরানের সঙ্গে নিবিড় আলোচনায় যুক্ত রয়েছে এবং ইসলামাবাদে সরাসরি আলোচনার জন্য আবারও আহ্বান জানিয়েছে।
মারিয়া সুলতান বলেন, ‘যদি কোনো আলোচনা না হয়, তাহলে যুদ্ধই হয়তো একমাত্র বিকল্প হয়ে থাকবে।’ তবে তিনি আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক আশাবাদও প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো খুব আশাবাদী যে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আলোচনা শুরু হবে। তারা বোঝে যে যুদ্ধের পরবর্তী ধাপের খরচ হবে বিপর্যয়কর—শুধু তাদের জন্য নয়, পুরো অঞ্চল এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও।’
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যেমনটা ভাবছে যে ইরানের নেতৃত্ব বিভক্ত—ব্যাপকভাবে প্রচলিত এই ধারণা নিয়ে একমত নন মারিয়া সুলতান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই তেহরান এক সুরেই কথা বলছে। এর আগে, একই অবস্থান ব্যক্ত করেন ইরান বিশ্লেষক ভালি নসর।
মারিয়া সুলতান বলেন, ‘ইরানের নেতৃত্ব বিভক্ত—এই ন্যারেটিভের সঙ্গে আমি একমত নই।’ তিনি বলেন, ‘মূল অ্যাজেন্ডা, তারা কী অর্জন করতে চায় এবং কীভাবে এগোতে চায়—এ বিষয়ে ইরানি নেতৃত্বের মধ্যে একধরনের ঐকমত্য রয়েছে। তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখন আরও বেশি সমঝোতাভিত্তিক, আরও বেশি যোগাযোগমুখী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে। ইসলামাবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে, এখানে অনুষ্ঠিত আলোচনাকে ঘিরে আমরা ঐকমত্য ও অগ্রগতির ইঙ্গিত পাচ্ছি।’
অপর দিকে, গতকাল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান আসিম মুনির মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর অনুরোধ জানান। তবে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে হরমুজ প্রণালি এবং ইরানের বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করে রাখার মার্কিন অবস্থানের প্রশ্নে। এ ছাড়া লেবানন এবং সেখানে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে রয়েছে। একই সঙ্গে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়টিও আলোচনায় জটিলতা তৈরি করছে।
এক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচক দলকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত পাকিস্তান। গত রাত পর্যন্ত ইরান আলোচনায় অংশ নেবে কি না, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চিত বার্তা দেয়নি। মার্কিন প্রশাসন যদি ইরানের বন্দরগুলো এবং হরমুজে অবরোধ শিথিল করতে আরও পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে ইরানি প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদে আসার সম্ভাবনা কম।
তবে কূটনৈতিক তৎপরতা এখনো তুঙ্গে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবধান এখনো বিস্তর এবং শিগগিরই আলোচনা শুরু হবে কি না, তা অনিশ্চিত। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ইসলামাবাদ সফরের কথা থাকলেও তা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। এখন সবার নজর তেহরানের দিকে—ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরাতে যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা