গাজায় ইসরায়েলের সামরিক হামলা ও গণহত্যার ভয়াবহতায় অন্তত ৭১ হাজার শিশু এতিম হয়েছে। স্বামী হারিয়েছেন অন্তত ৬৪ হাজার নারী। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার শিশুর কোনো নিবন্ধিত অভিভাবক, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা দেখাশোনা করার মতো কেউই নেই। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ, দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি ও আশ্রয়সংকটের মধ্যে এসব শিশু ও নারীর জীবন ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের খবরে বলা হয়েছে, গাজার সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী—২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া ইসরায়েলি গণহত্যার পর থেকে ৫৪ হাজার ৪৬৮টি শিশু তাদের বাবা-মায়ের একজনকে অথবা দুজনকেই হারিয়েছে। ৭১ হাজার এতিম শিশু ও ৬৪ হাজার স্বামীহারা নারীর সামগ্রিক হিসাবের মধ্যে অবশ্য আগের বছরগুলোতে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক হামলায় স্বামী বা মা-বাবাকে হারানো ব্যক্তিরাও রয়েছেন।
এতিম শিশুদের এই সংকটের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে তিন আবু আসের ভাইবোনের জীবনে। ১৬ বছর বয়সি মারিয়াম, ১৪ বছর বয়সি আয়া ও ১২ বছর বয়সি জিবরিল প্রতি দুই দিন পরপর এক খালার তাঁবু থেকে অন্য খালার তাঁবুতে যায়। ২০১৪ সালে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে বাবাকে হারিয়েছিল তারা। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া হামলায় গাজা শহরে তাদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেলে মা ইসলামের সঙ্গে মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় একটি অস্থায়ী তাঁবুতে আশ্রয় নেয় তারা।
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ১৯ দিন পর ইসরায়েলের একটি বোমা তাদের তাঁবুতে আঘাত হানে। তিন ভাইবোনের চোখের সামনেই নিহত হন তাদের মা। হামলায় আহতও হয় সবচেয়ে ছোট জিবরিল। বিস্ফোরণের সময় সে মায়ের কোলে বসে ছিল।
শিশুদের দেখাশোনা করছেন তাদের মায়ের দিকের খালারা। তাঁদের দুজনও গণহত্যার সময় স্বামীকে হারিয়েছেন এবং নিজেদের সন্তানদের একাই বড় করছেন। স্বামীহারা খালা ওয়ারদা আল-মুজেইনি সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে বলেন, শিশুদের কোনো স্থায়ী থাকার জায়গা নেই। তারা একেক খালার কাছে দুই রাত করে কাটায়। মুজেইনি বলেন, ‘আমরা তাদের মানসিকভাবে সামলে ওঠার চেষ্টা করি, বিশেষ করে সবচেয়ে ছোট জিবরিলকে। সে নিজের চোখের সামনে মাকে মারা যেতে দেখেছে।’
নিজের স্বামীকেও ইসরায়েলের বিমান হামলায় হারিয়েছেন মুজেইনি। চার সন্তানকে নিয়ে তাঁর সংসার। কোনো চাকরি বা নির্ভরযোগ্য আয়ের ব্যবস্থা না থাকায় দিনে একবেলা খাবার জোগাড় করতেও তাঁকে হিমশিম খেতে হয়। তিনি বলেন, ‘আমার আরেক স্বামীহারা বোন এবং আমি নিজেদের সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতেই সংগ্রাম করছি। কিন্তু আমাদের বোনের সন্তানদেরও দেখাশোনা করতে হচ্ছে, কারণ তাদের আর কেউ নেই।’
তিন বোন নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী শিশুদের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেন। কেউ পায়জামা কিনে দেন, কেউ চটি, আবার কেউ কয়েক দিনের হাতখরচ দেন।
গাজার সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আজিজা আল-খালুত বলেন, এতিম শিশুদের দুর্ভোগ কেবল মা-বাবাকে হারানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা নিরাপত্তা, যত্ন, শিক্ষা ও স্বাভাবিক শৈশব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক শিশুকে বয়সের তুলনায় অনেক বেশি দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, অর্থনৈতিক ও মানবিক পরিস্থিতির অবনতি এবং পর্যাপ্ত আশ্রয়ের অভাবে এতিম শিশুদের স্কুলছুট হওয়া ও অল্প বয়সে বিয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি এবং পরিবারের উপার্জনকারীকে হারানোর কারণে শিশুশ্রমের ঝুঁকিও বাড়ছে।
যেসব নারী পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হয়ে পড়েছেন, তাঁদের একদিকে সন্তানদের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হচ্ছে, অন্যদিকে যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তাদের বড় করে তুলতে হচ্ছে।
গাজায় এমন শিশুও রয়েছে, যারা পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য হিসেবে বেঁচে আছে। তাদের শোক ভাগ করে নেওয়ার মতো মা-বাবা কিংবা ভাইবোন কেউ নেই। এমনই একজন ওয়াফা আল-আত্তার। ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তাঁর বয়স ছিল ১০ বছর। বাবার মোবাইল ফোনে চার্জ দেওয়ার জন্য তিনি পাশের বাড়িতে থাকা চাচার বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেই সময় মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় তাঁদের বাড়িতে ইসরায়েলের বিমান হামলা হয়। এতে তাঁর বাবা আহমেদ, মা খাওলুদ এবং চার ভাইবোন নিহত হয়।
নিহত ভাইবোনদের মধ্যে ছিল আট বছর বয়সি রিতাল, পাঁচ বছর বয়সি মুহাম্মদ, তিন বছর বয়সি ওবাদা এবং মাত্র নয় মাস বয়সি ইয়াজান। হামলায় আত্তার সামান্য আহত হন। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও প্রথমে পরিবারের পরিণতি জানানো হয়নি। পরে চাচা এসে তাঁকে মৃত্যুর খবর জানান। এখন ১৩ বছর বয়সি আত্তার মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘চোখের পলকেই আমি আমার পুরো পরিবারকে হারিয়ে ফেলেছিলাম।’
তিনি বলেন, পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে হারানোর বিষয়টি মেনে নিতে তাঁর কয়েক মাস লেগেছিল। প্রথম দিকে দাদা-দাদির সঙ্গে থাকতেন তিনি। বারবার মনে হতো, হামলার সময় পরিবারের সঙ্গে বাড়িতে থাকলে হয়তো তাঁরও মৃত্যু হতো। আত্তার বলেন, ‘কয়েক মাস ধরে আমার মনে হতো, বোমা হামলার সময় আমিও যদি তাদের সঙ্গে বাড়িতে থাকতাম! আমারও যদি তাদের সঙ্গে মৃত্যু হতো!’
পরে চাচা, চাচি ও তাঁদের নবজাতক সন্তানের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন তিনি। চাচা-চাচির সান্ত্বনা তাঁকে কিছুটা সামলে উঠতে সাহায্য করে। তবে পরিবারের শূন্যতা কাটেনি। আত্তার বলেন, ‘তাঁরা আমাকে সাহায্য ও সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এতে আমার কষ্ট কিছুটা কমেছে। কিন্তু আমি জানি, আমার নিজের পরিবারের জায়গা অন্য কেউ কখনোই নিতে পারবে না।’
গাজার সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সতর্কবার্তা, এতিম শিশু ও স্বামীহারা নারীদের দুর্ভোগের প্রকৃত চিত্র শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। যুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়ানো এসব মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।