হরমুজ প্রণালি বরাবরই ইরানের অন্যতম শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র। এত দিন এই জলপথ দিয়ে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার খবর শোনা যেত। তবে চলমান সংঘাতের জেরে এবার বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের সূত্রমতে, দেশটির আইনপ্রণেতারা গুগল, মেটা এবং মাইক্রোসফটের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্টদের ওপর বার্ষিক ফি ধার্য করার একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছেন। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাইবার-অপটিক ক্যাবল বা সাবমেরিন ক্যাবল হরমুজ প্রণালির তলদেশ দিয়ে গেছে। বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ ইন্টারনেট যোগাযোগই সমুদ্রের তলদেশের ক্যাবলের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়।
মঙ্গলবার (১৯ মে) প্রভাবশালী টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে বলা হয়—হরমুজ প্রণালিটি ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের সংযোগ স্থাপনের পাশাপাশি পারস্য উপসাগরীয় দেশ ও মিশরে ইন্টারনেট সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর। এই ক্যাবলগুলোতে সামান্যতম বিঘ্ন ঘটলে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট সেবা মন্থর বা বিচ্ছিন্ন হতে পারে। এর ফলে শুধু যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্ট্রিমিং বা অনলাইন গেমিং ব্যাহত হবে তা নয়; বরং সামরিক যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ই-কমার্সের মতো জরুরি ডিজিটাল সেবাও স্থবির হয়ে পড়বে।
ইরান সরকার অবশ্য এখন পর্যন্ত ক্যাবলগুলোর জন্য ফি নির্ধারণ বা অনুমতিপত্র বাধ্যতামূলক করার কোনো আনুষ্ঠানিক নীতি বা আইন পাস করেনি। তবে সমুদ্রের তলদেশের ক্যাবলগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার এই আকাঙ্ক্ষা মূলত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর দেশটির নিয়ন্ত্রণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ারই একটি অংশ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে অধিকাংশ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় এবং জানায়, যুদ্ধ শেষে নিরাপদ ট্রানজিটের জন্য শুল্ক আদায় করা হবে। এরপর গত ১৩ এপ্রিল মার্কিন নৌবাহিনী জোর করে এই প্রণালি খুলে দেওয়ার চেষ্টা করলে ইরান একে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের শামিল বলে নিন্দা জানায়।
ইরানের সংসদীয় বোর্ডের সদস্য হোসেইন আলি হাজিদেলিগানি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি হলো আল্লাহর দেওয়া এক নিয়ামত, যা ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’ এই প্রেক্ষাপটে দেশটির সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি সরাসরি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেন—‘আমরা ইন্টারনেট ক্যাবলের ওপরও ফি ধার্য করব।’ ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমগুলোও ইঙ্গিত দিয়েছে, এই ক্যাবল থেকে ইরান লাইসেন্স ফি এবং বার্ষিক নবায়ন ফি আদায় করতে পারে এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোকে ইরানি আইনের অধীনে কাজ করতে বাধ্য করতে পারে। ক্যাবলগুলোর ক্ষতি হলে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিদিন কোটি কোটি ডলার ক্ষতি হবে বলেও তারা মনে করিয়ে দিয়েছে।
এই বিষয়ে আল হাবতুর রিসার্চ সেন্টারের সিনিয়র গবেষক মোস্তফা আহমেদ বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি শুধু জ্বালানি পরিবহনের সংকীর্ণ পথ নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল ব্লকিং পয়েন্ট বা সংকীর্ণ পথ। এই অগভীর ও অস্থির সামুদ্রিক করিডোরে একাধিক ক্যাবলের গুচ্ছ থাকায় এটি বৈশ্বিক ইন্টারনেটের প্রধান দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে।’
টেলিকম গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘টেলিজিওগ্রাফি’-এর তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পাঁচটি বাণিজ্যিক সাবমেরিন ক্যাবল সিস্টেম চলে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে এশিয়া-আফ্রিকা-ইউরোপ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া-মধ্যপ্রাচ্য-পশ্চিম ইউরোপ সিস্টেম। এ ছাড়া ‘ফ্যালকন’ এবং ‘গালফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল’ নামে আরও দুটি সিস্টেম ইরানের জলসীমার মধ্য দিয়ে গেছে। লোহিত সাগর থেকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই করিডরটি ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়ার মধ্যে সিংহভাগ ডেটা ট্রাফিক বহন করে।
তাই এখানে কোনো বিপর্যয় ঘটলে মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে কাতার, বাহরাইন এবং কুয়েতের মতো বিকল্প ক্যাবলহীন দেশগুলো তাৎক্ষণিকভাবে অচল হয়ে পড়বে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত বা সৌদি আরবের মতো কিছু দেশের বিকল্প স্থলপথ বা লোহিত সাগরের রুট রয়েছে।
টাটা কমিউনিকেশনসের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট জিনিয়াস ওয়াং জানান, অপারেটরেরা সাধারণত এমনভাবে নেটওয়ার্ক তৈরি করেন যাতে সেকেন্ডের মধ্যে বিকল্প রুটে আবারও ডেটা পরিচালনা করা যায়। তবে হাবতুর রিসার্চ সেন্টারের সিনিয়র গবেষক মোস্তফা আহমেদের মতে, হরমুজ প্রণালির ডেটার পরিমাণ এত বেশি যে, বড় ধরনের ক্ষতি হলে বিকল্প রুটগুলো সেই চাপ সামলাতে পারবে না। ভারতে ২৪ ঘণ্টার ইন্টারনেট বিভ্রাটের কারণে দেশটির আইটি খাতের প্রায় ৯২০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হতে পারে।
সমুদ্রে জাহাজের নোঙরের টানে ক্যাবল কেটে যাওয়ার ঘটনা প্রায় সময়ই ঘটে। তবে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এগুলো মেরামত করা অত্যন্ত জটিল হতে পারে। বিশ্বে মাত্র ৬০ টির মতো বিশেষায়িত মেরামতকারী জাহাজ রয়েছে, যাদের যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করতে সামরিক পাহারার প্রয়োজন হবে এবং বিমা কোম্পানিগুলোও এই সময়ে ঝুঁকি নিতে চাইবে না।
আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে স্থাপিত ক্যাবলের ওপর ইরানের হঠাৎ করে ‘সুরক্ষা ফি’ বা শুল্ক আরোপ করা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে যৌক্তিক হবে না। তা ছাড়া, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বেশির ভাগ ক্যাবল ওমানের জলসীমা দিয়ে নেওয়া হয়েছে, যেখানে ইরানের কোনো আইনি এখতিয়ার নেই। অন্যদিকে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আমেরিকার প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর পক্ষে ইরানকে কোনো অর্থ দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু অর্থ প্রদানে অস্বীকৃতি জানালে ক্যাবলগুলোতে নাশকতার ঝুঁকি বাড়বে, যা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে এই অঞ্চল থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নিতে বাধ্য করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান ডুবুরিদের মাধ্যমে ক্যাবল কেটে দিয়ে, পানির নিচের চালকহীন যান দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অথবা মাইন পেতে বা বাণিজ্যিক জাহাজের নোঙর টেনে ক্যাবল ছিঁড়ে ফেলে ক্ষতি করতে পারে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে লোহিত সাগরে হুতিদের আক্রমণে কয়েকটি সাবমেরিন কেবল কেটে গিয়েছিল। এর ফলে ইউরোপ-এশিয়ার প্রায় ৭০ শতাংশ ইন্টারনেট ট্রাফিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
ইরানের এই অবস্থান তেল-নির্ভরতা থেকে বের হয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্লাউড প্রযুক্তির দিকে ধাবিত হতে চাওয়া উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বড় একটি ধাক্কা হবে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব মাইক্রোসফট, অ্যামাজন এবং গুগলের সঙ্গে মিলে শত কোটি ডলারের ডেটা সেন্টার তৈরি করছে, যা সম্পূর্ণ লো-ল্যাটেন্সি সাবমেরিন ক্যাবলের ওপর নির্ভরশীল। তারপরও ইন্টারনেট অবকাঠামোতে আঘাত বা এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে একটি ‘অস্তিত্বের সংকট’ তৈরি করতে পারে।