হোম > বিশ্ব > লাতিন আমেরিকা

ভেনেজুয়েলায় তেলের মজুত কত, মার্কিন কোম্পানিগুলো কি ব্যবসার সুযোগ পাবে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

কারাকাসে পেত্রোলিওস দে ভেনেজুয়েলা সদর দপ্তরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ‘পিস মনুমেন্ট’ ভাস্কর্য। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার মাঝেই ওয়াশিংটনের দেওয়া বিশেষ লাইসেন্সের ভিত্তিতে দেশটিতে আংশিকভাবে কার্যক্রম পুনরায় চালুর অনুমতি পায় জ্বালানি সংস্থা শেভরন। ছবি: এএফপি

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলার পর দেশটির তেল খাতের দিকে নতুন করে সবার নজর পড়েছে, যেখানে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ খনিজ তেলের মজুত রয়েছে। গতকাল শনিবারের হামলার পর এক জনসমাবেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা তেলের অবকাঠামো পুনর্গঠন করতে যাচ্ছি, যাতে কোটি কোটি ডলার খরচ হবে এবং তেল কোম্পানিগুলো সরাসরি সেই খরচ বহন করবে। আমরা এমনভাবে তেল উৎপাদন শুরু করব যা হওয়া উচিত।’ এই আক্রমণের মাধ্যমে আমেরিকা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে বন্দী করেছে।

২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলায় আনুমানিক ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের মজুত রয়েছে, যা বিশ্বে বৃহত্তম জ্বালানি তেলের মজুত। ২৬৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ব্যারেল নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে সৌদি আরব। এরপর ২০৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ব্যারেল নিয়ে ইরান এবং ১৬৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ব্যারেল নিয়ে কানাডার অবস্থান যথাক্রমে তিন ও চারে। এই চারটি দেশ মিলে বিশ্বের মোট তেল মজুতের অর্ধেকেরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করে।

সেই তুলনায় আমেরিকার তেলের মজুত মাত্র ৫৫ বিলিয়ন ব্যারেল, যা দেশটিকে বিশ্ব তালিকায় নবম স্থানে রেখেছে। এর অর্থ হলো—ভেনেজুয়েলার তেলের মজুত আমেরিকার চেয়ে পাঁচ গুণেরও বেশি বেশি। বিশ্বজুড়ে প্রমাণিত তেলের মজুত—যা বর্তমান প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ীভাবে উত্তোলনযোগ্য—তার পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৭৩ ট্রিলিয়ন ব্যারেল।

ভেনেজুয়েলার তেলের মজুত মূলত অরিনোকো বেল্টে অবস্থিত। দেশটির পূর্বাঞ্চলের প্রায় ৫৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে এই বিশাল অঞ্চল বিস্তৃত। অরিনোকো বেল্টে অতিরিক্ত ভারী অপরিশোধিত তেল রয়েছে, যা অত্যন্ত ঘন এবং আঠালো। ফলে প্রচলিত তেলের তুলনায় এটি উত্তোলন করা অনেক বেশি কঠিন এবং ব্যয়বহুল। এই অঞ্চলের তেল উৎপাদনের জন্য স্টিম ইনজেকশন এবং বাজারজাত করার উপযোগী করতে হালকা তেলের সঙ্গে মিশ্রণের মতো উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়।

অধিক ঘনত্ব এবং সালফারের উপস্থিতির কারণে এই অতিরিক্ত ভারী তেল সাধারণত হালকা ও উন্নত মানের তেলের তুলনায় কম দামে বিক্রি হয়। দেশটির তেল উৎপাদন মূলত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি পিডিভিএসএ—এর নিয়ন্ত্রণে, যারা অরিনোকো বেল্টের অধিকাংশ কার্যক্রম পরিচালনা করে। পিডিভিএসএ ঐতিহাসিকভাবে জরাজীর্ণ অবকাঠামো, বিনিয়োগের অভাব, অব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এসব কারণে ভেনেজুয়েলা তার বিশাল মজুত পুরোপুরি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে।

সরকারি ভর্তুকির কল্যাণে ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের অন্যতম সস্তা দরে পেট্রোল পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, ৯৫ অকটেন পেট্রোলের দাম ছিল প্রতি লিটারে দশমিক ৮৪ ভেনেজুয়েলান বলিভার বা লিটারপ্রতি প্রায় ৪ সেন্ট এবং গ্যালনপ্রতি দশমিক ১৩ ডলার। এটি লিবিয়া এবং ইরানের চেয়ে সামান্য বেশি, যেখানে পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ৩ সেন্ট। বিপরীতে, বিশ্বে পেট্রোলের গড় দাম লিটারপ্রতি ১ দশমিক ২৯ ডলার বা গ্যালনপ্রতি ৪ দশমিক ৮৮ ডলার।

বর্তমানে ভেনেজুয়েলায় কেবল একটি মার্কিন তেল কোম্পানি কাজ করছে—হিউস্টনভিত্তিক শেভরন। তারা এখন ভেনেজুয়েলার মোট তেল উৎপাদনের ২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। অন্য কোনো বড় পশ্চিমা কোম্পানি সেখানে উল্লেখযোগ্য উৎপাদন করছে না। ভেনেজুয়েলার সাবেক ও প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ ২০০৬ সাল থেকে বেসরকারি বিদেশি তেল স্বার্থ জাতীয়করণ শুরু করলে এক্সন মবিল এবং কনোকোফিলিপসসহ অন্যান্য মার্কিন জ্বালানি জায়ান্টরা ভেনেজুয়েলা থেকে চলে যায়।

এরপর, ২০০৫ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ভেনেজুয়েলার ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদ দমনে ব্যর্থতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অধীনে ২০১৯ সালে আমেরিকা ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ-এর সম্পদ জব্দ করে এবং আমেরিকানদের তাদের সঙ্গে ব্যবসা করা নিষিদ্ধ করে।

সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন চারটি কোম্পানি এবং সংশ্লিষ্ট তেল ট্যাংকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, যাদের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার তেল খাতের যোগসূত্র রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ডিসেম্বরের শুরুর দিকে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় আসা-যাওয়া করা সমস্ত নিষিদ্ধ তেল ট্যাংকারের ওপর "সম্পূর্ণ অবরোধের" ডাক দেন এবং আমেরিকা দুটি নিষিদ্ধ জাহাজ জব্দ করে।

২০২২ সালে আমেরিকা যখন উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং জ্বালানি সংকটের মুখে পড়ে, তখন বাইডেন প্রশাসনের দেওয়া এক বিশেষ অনুমতির অধীনে শেভরন ভেনেজুয়েলায় তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত বছর সেই বিশেষ লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়িয়েছেন।

তেল উৎপাদন বাড়াতে ভেনেজুয়েলাকে এখন বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভর করতে হবে। কারণ, তাদের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি পিডিভিএসএ আর্থিকভাবে দেউলিয়া। এটি মার্কিন কোম্পানিগুলোর পুনরায় বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দিতে পারে। নতুন বিনিয়োগ পেলে ভেনেজুয়েলার বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে দ্রুত তেল উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। তবে, যেকোনো বিনিয়োগ মার্কিন হামলা এবং মাদুরোকে অপসারণের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। মার্কিন জ্বালানি উৎপাদনকারীদের আকৃষ্ট করতে ভেনেজুয়েলাকে বাণিজ্যিক, আর্থিক এবং চুক্তিভিত্তিক বিশেষ সুযোগ দিতে হবে।

সম্পদের দিক থেকে ভেনেজুয়েলার কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। সবকিছু এখন রাজনীতির ওপর নির্ভর করছে। স্বল্প মেয়াদে শেভরন সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। কারণ, ভেনেজুয়েলায় আগে থেকেই তাদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। এ ছাড়া কনোকোফিলিপস এবং এক্সন-এর মতো অন্যান্য মার্কিন কোম্পানিগুলোও সেখানে ব্যবসায় ফিরতে পারে।

তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা ও সিবিএস

ভেনেজুয়েলায় অরক্ষিত হয়ে পড়েছে চীনা প্রযুক্তিগত অবকাঠামো

‘ঠিকঠাক’ করার নামে অন্তত ১৮ মাস ভেনেজুয়েলা নিয়ন্ত্রণ করতে চান ট্রাম্প

প্রয়োজনে শপথ ভেঙে আবারও অস্ত্র হাতে তুলে নেব—ট্রাম্পকে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট

লাতিন অঞ্চলে মার্কিন হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ডাক কিউবার

হাতকড়া পরিয়ে আদালতে নেওয়া হলো মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে

যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সহযোগিতার’ ঘোষণা ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের

কারাকাসে মার্কিন হামলার সময় নিহত কিউবার ৩২ যোদ্ধা

‘দ্য প্রিন্স’ খ্যাত মাদুরোপুত্রের বিরুদ্ধে গোপন মাদক সাম্রাজ্য চালানোর অভিযোগ

ভেনেজুয়েলায় ভিয়েতনামের পরিণতি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের—বিশেষজ্ঞ মত

ভেনেজুয়েলার তেল বেচে লাভের ভাগ নেবে যুক্তরাষ্ট্র, আছে পুরোনো হিসাব