ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলে আঘাত হেনেছে দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকম্প। রিখটার স্কেলে এর একটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২ এবং অন্যটির ৭ দশমিক ৫। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর দেশটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ। জোড়া ভূমিকম্পের পর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও বিপুল প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই ভূমিকম্পের কারণে ১০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, গ্রিনিচ মান সময় রাত ১০টা ৪ মিনিটে রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ২৮৪ কিলোমিটার পশ্চিমে সান ফেলিপের কাছে প্রথম ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর ঠিক পরপরই কারাকাস থেকে প্রায় ২৯৩ কিলোমিটার পশ্চিমে ইউমারের কাছে দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়, যার মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৫।
ভূমিকম্প দুটি মোরন শহর থেকে ২১ কিলোমিটার দূরে ভূগর্ভে উৎপন্ন হয়েছিল। এর তীব্র কম্পন ট্রুজিলো, কারাবোবো, মিরান্ডা ও লা গুয়াইরা রাজ্যসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অত্যন্ত মারাত্মকভাবে অনুভূত হয়েছে।
ইউএসজিএস তাদের প্রাথমিক মূল্যায়নে জানিয়েছে, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও বিপুলসংখ্যক মানুষের হতাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং এই বিপর্যয় সম্ভবত বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সংস্থাটির অনুমান, এই বিপর্যয়ে নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার থেকে ১ লাখ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তবে ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে নিহত বা আহতের কোনো সরকারি পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি।
ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়বিষয়ক মন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয় বলে স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, সরকার দ্রুত উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা সক্রিয় করতে কাজ করে যাচ্ছে। কাবেলো বলেন, ‘শিশু এবং বৃদ্ধদের বিষয়ে খুব সতর্ক থাকুন; একে অপরকে ফোন করুন এবং খোঁজ নিন যে কেউ কোনো আঘাত পেয়েছে কি না।’
তিনি আরও জানান, রাজধানী কারাকাসের অভিজাত আলতামিরা এলাকার পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও রেস্তোরাঁয় ঠাসা এই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি বহুতল ভবন ধসে পড়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলোকে নির্বিঘ্নে কাজ করার সুযোগ দিতে তিনি গাড়িচালকদের রাস্তা ফাঁকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা কারাকাসের ছবিতে দেখা গেছে, আলতামিরা এলাকায় একটি ২২ তলা ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। জরুরি উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা সেখান থেকে অনেককে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের বাইরে আটকে পড়া মানুষের স্বজনদের আকুল চিৎকার এবং উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য টর্চলাইট চেয়ে মানুষের আকুতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে।
মিরান্ডা রাজ্যের চাকাহোর মেয়র জানিয়েছেন, তাঁর এলাকায় অনেক মানুষ হতাহত হয়েছেন বলে তাঁরা আশঙ্কা করছেন।
ভূমিকম্পের তীব্রতা কতটা ভয়াবহ ছিল—তা ফুটে উঠেছে লা গুয়াইরা অঞ্চলের এক প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণী থেকে। বিমানবন্দর এলাকার কাছাকাছি থাকা ওই ব্যক্তি জানান, কারাকাসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। তবে তার চারপাশের সমস্ত ভবন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে এবং সামনের মূল সড়কটি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। তিনি কারাকাসে ফিরে আসার চেষ্টা করলেও সব রাস্তাঘাট বন্ধ রয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ নিশ্চিত করেছেন, মাইকেটিয়ার সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটি আপাতত সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
১৮২১ সালের একটি ঐতিহাসিক সামরিক বিজয়কে স্মরণ করে ভেনেজুয়েলায় এদিন সরকারি ছুটি চলছিল। স্পেনের কাছ থেকে দেশটির স্বাধীনতা নিশ্চিত করার এই উৎসবে মানুষ যখন ঘরে অবস্থান করছিলেন, ঠিক তখনই ভূমিকম্পটি আঘাত হানে।
পশ্চিম কারাকাসের ৪১ বছর বয়সী পাবলিসিস্ট আস্ট্রিড রামিরেজ বলেন, ‘ভূমিকম্প শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা মানুষের চিৎকার শুনতে পাই। সবাই অ্যাপার্টমেন্টের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার জন্য হুড়োহুড়ি করে দৌড়াচ্ছিল।’
পূর্ব কারাকাসের বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সী কোরো মার্টিনেজ তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘খুব জোরে একটা ভেঙে পড়ার শব্দ হয়েছিল। ঘরের ভেতরের জিনিসপত্র, এমনকি রেফ্রিজারেটরের ভেতরের জগগুলোও আছড়ে পড়ে। আমি জীবনে কখনো এমন ভয়ানক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইনি।’
দেশজুড়ে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা নিশ্চিত হতে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে এখনো পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন ও তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ।