ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের বহুল প্রতীক্ষিত অষ্টম পে কমিশন স্রেফ একটি রুটিনমাফিক বেতন সংশোধনের প্রক্রিয়া পেরিয়ে এখন বড় ধরনের জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কর্মচারীদের বেতন ও পেনশন বাড়ানোর দাবির বিপরীতে সরকারের আর্থিক সাধ্য ও বাজেটের ওপর চাপ নিয়ে এখন নীতিনির্ধারক মহলে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি প্রস্তাব, যা গৃহীত হলে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন ৪০০ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে।
অষ্টম পে কমিশনের চলমান আলোচনা ও গণশুনানিতে অন্যতম প্রধান অংশীদার ‘ইন্ডিয়ান রেলওয়ে টেকনিক্যাল সুপারভাইজার্স অ্যাসোসিয়েশন’ একটি অভূতপূর্ব প্রস্তাব পেশ করেছে। বিগত পে কমিশনগুলোর প্রথা ভেঙে এবার সব স্তরের কর্মচারীদের জন্য অভিন্ন ফিটমেন্ট ফ্যাক্টরের পরিবর্তে পে-লেভেল অনুযায়ী আলাদা পাঁচটি ফিটমেন্ট ফ্যাক্টরের দাবি জানিয়েছে তারা।
লেভেল ১ থেকে ৫: ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ২.৯২
লেভেল ৬ থেকে ৮: ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ৩.৫০
লেভেল ৯ থেকে ১২: ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ৩.৮০
লেভেল ১৩ থেকে ১৬: ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ৪.০৯
লেভেল ১৭ থেকে ১৮: ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ৪.৩৮
এই প্রস্তাব গৃহীত হলে বেতনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটবে। উদাহরণস্বরূপ, লেভেল ১৭ বা ১৮-এর একজন শীর্ষ কর্মকর্তা, যাঁর বর্তমান মূল বেতন ২ দশমিক ৫ লাখ রুপি, প্রস্তাবিত ৪ দশমিক ৩৮ ফ্যাক্টর অনুযায়ী তাঁর নতুন সংশোধিত মূল বেতন দাঁড়াবে প্রায় ১০ দশমিক ৯৫ লাখ রুপি।
একইভাবে মধ্যস্তরের কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও (লেভেল ৬ থেকে ৮) ৪৫ হাজার রুপি মূল বেতন একলাফে বেড়ে ১ দশমিক ৫৭ লাখ রুপি হতে পারে।
অ্যাসোসিয়েশনের যুক্তি, বর্তমান বেতনকাঠামোতে জুনিয়র ও সিনিয়র কর্মীদের বেতনের ব্যবধান অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে, রেলের মতো স্পর্শকাতর প্রযুক্তিগত বিভাগে যেখানে নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত, সেখানে এই অসংগতি দূর করা জরুরি। এ ছাড়া কারিগরি কর্মীদের জন্য পৃথক বেতনকাঠামো, ৫ শতাংশ বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি এবং মূল বেতনের সঙ্গে ৫০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) একীভূত করার দাবিও জানানো হয়েছে।
পে কমিশনের বেতন নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি হলো ‘ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর’ (Fitment Factor)। এটি মূলত একটি গুণক ফর্মুলা, যা বর্তমান মূল বেতনের সঙ্গে গুণ করে নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়।
নতুন মূল বেতন=বর্তমান মূল বেতন x ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর
সপ্তম পে কমিশনে এই ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ছিল ২ দশমিক ৫৭। এবার বিভিন্ন কর্মচারী ইউনিয়ন আরও অনেক বেশি দাবি করছে। কেউ ৩ দশমিক ৮৩ ফ্যাক্টরের দাবি জানিয়েছে, আবার ‘ভারতীয় প্রতিরক্ষা মজদুর সংঘ’ ৪ দশমিক শূন্য ফিটমেন্ট ফ্যাক্টরসহ ন্যূনতম বেতন ৭২ হাজার রুপি করার দাবি তুলেছে। ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল-জয়েন্ট কনসালটেটিভ মেশিনারি’ ন্যূনতম বেসিক পে ৬৯ হাজার রুপি করার দাবি জানিয়েছে।
কর্মচারীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও প্রত্যাশা থাকলেও বিশ্লেষকদের মনে বড় প্রশ্ন—ভারত সরকার কি এই বিশাল আর্থিক বোঝা বহন করতে পারবে?
ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা আড়ালে স্বীকার করছেন যে, সব দাবি হয়তো মানা সম্ভব হবে না। কারণ, সরকারকে একদিকে কর্মীকল্যাণ এবং অন্যদিকে রাজকোষের ওপর চাপ, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও ভবিষ্যৎ পেনশন দায়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর অতিরিক্ত বাড়ানো হলে তা কেবল তাৎক্ষণিক বেতনই বাড়াবে না, বরং গ্র্যাচুইটি, পেনশন, অন্যান্য ভাতা ও দীর্ঘমেয়াদি অবসরকালীন আর্থিক দায় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। কেবল কেন্দ্র নয়, ঐতিহাসিকভাবে কেন্দ্রীয় পে কমিশনের সুপারিশের পর রাজ্য সরকারগুলোও তাদের নিজস্ব বেতনকাঠামো সংশোধন করে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
এ কারণে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, সরকার শেষ পর্যন্ত একটি মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে পারে। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে কিছু যৌক্তিক দাবি মানা হলেও চরম প্রস্তাবগুলো কিছুটা হ্রাস করা হতে পারে।
ইউনিয়নগুলোর আরেকটি অন্যতম জোরালো দাবি হলো—বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘ফ্যামিলি ইউনিট’ বা পরিবারের সদস্যসংখ্যার ফর্মুলা তিনজন থেকে বাড়িয়ে পাঁচজন করা। তাদের দাবি, আধুনিক জীবনযাত্রায় আবাসন, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষার খরচ যেভাবে বেড়েছে, তাতে স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান ছাড়াও বয়োবৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব সামলাতে কর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন।
পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ‘পুরোনো পেনশন প্রকল্প’ (ওপিএস) ফিরিয়ে আনার দাবিও বহাল রয়েছে। তবে দীর্ঘ বছর ধরে জাতীয় পেনশন ব্যবস্থা (এনপিএস) চালুর পর তা পুরোপুরি বাতিল করা বাস্তবসম্মত নয় বলে স্বীকার করছেন অনেক ইউনিয়ন নেতাই। ফলে সম্পূর্ণ ওপিএসে ফেরার চেয়ে এখন জোর দেওয়া হচ্ছে ওপিএসের মতো সুবিধা বা ন্যূনতম নিশ্চিত পেনশনের গ্যারান্টির ওপর।
অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাইয়ের নেতৃত্বে গঠিত অষ্টম পে কমিশন ইতিমধ্যে রাজধানী দিল্লিসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গণশুনানি ও অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক শুরু করেছে।
কমিশন আগামী ৬ ও ৭ জুলাই ভুবনেশ্বরে সফর করার ঘোষণা দিয়েছে। এরপর লক্ষ্ণৌ, হায়দরাবাদ, শ্রীনগর, লাদাখ ও জম্মু-কাশ্মীরেও কর্মচারী ইউনিয়ন এবং পেনশনভোগী সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে।
২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর গঠিত এই কমিশনের সুপারিশের ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ কর্মী, পেনশনভোগী এবং তাঁদের পরিবারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। ১৯৪৬ সাল থেকে প্রতি দশকে এই পে কমিশন গঠনের ঐতিহ্য চলে আসছে। তবে বর্তমানের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি ও অভ্যন্তরীণ আর্থিক চাপের মুখে এই অষ্টম পে কমিশনের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।