হোম > বিশ্ব > ভারত

চার মাসে ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিলেন বিচারক, ১০০ মামলা পাঠানো হলো অন্য আদালতে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

বিচারক রবি কুমার দিওয়াকর। ছবি: সংগৃহীত

উত্তর প্রদেশের মুজাফফরনগরের একটি ফাস্ট-ট্র্যাক আদালতের বিচারক গত চার মাসে ১০টি মামলায় ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এই ঘটনার পর তাঁর আদালতে বিচারাধীন প্রায় ১০০টি হত্যা মামলা অন্য বিচারকের আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে। সরকারি এক আইনজীবী ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে এই তথ্য জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই আইনজীবী জানিয়েছেন, অতিরিক্ত জেলা ও সেশনস জজ রবি কুমার দিওয়াকরের আদালতে থাকা এসব মামলা জেলা ও সেশনস জজ বীরেন্দ্র কুমার সিংয়ের আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলাগুলো এমন অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত, যেগুলোর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। মুজাফফরনগর জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রমোদ ত্যাগী বলেন, বিচারক দিওয়াকরের আদালত থেকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আইনজীবী ও মামলার পক্ষগুলোর মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

কে এই রবি কুমার দিওয়াকর

বিচারক রবি কুমার দিওয়াকর ২০২২ সালে বারাণসীর জ্ঞানবাপী কমপ্লেক্সের ভিডিওগ্রাফি জরিপের নির্দেশ দেওয়ার পর জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় এসেছিলেন। তিনি কঠোর রায় দেওয়ার জন্য পরিচিত। লক্ষ্ণৌয়ের বাসিন্দা ৪৬ বছর বয়সী দিওয়াকর ২০০৯ সালে আজমগড়ে অতিরিক্ত সিভিল জজ হিসেবে বিচারিক জীবন শুরু করেন। এরপর ২০১৫ সালের মে মাসে তিনি সুলতানপুরে সিভিল জজ হিসেবে পদোন্নতি পান। প্রায় পাঁচ মাস পর তিনি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পদে উন্নীত হন।

বিচারক দিওয়াকরের শিক্ষাগত যোগ্যতার মধ্যে রয়েছে বাণিজ্যে স্নাতক এবং এলএলএম ডিগ্রি। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে তিনি মুজাফফরনগরের অতিরিক্ত জেলা ও সেশনস জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

চার মাসে ১০ মামলায় ২২ মৃত্যুদণ্ড

বিচারক দিওয়াকরের আদালত থেকে সাম্প্রতিক সময়ে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের উল্লেখযোগ্য মামলাগুলো হলো—গত ১৩ আগস্ট ১২ বছর আগের এক হত্যা মামলায় রামবীর, রাজীব, রাহুল ও হরেন্দর কুমার নামে চারজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন বিচারক দিওয়াকর। তাদের প্রত্যেককে দোষী সাব্যস্ত করার পাশাপাশি মোট ১ লাখ ৭০ হাজার রুপি জরিমানাও করা হয়। ২০১৪ সালের ১৪ জুলাই শামলি জেলায় পুরোনো শত্রুতার জেরে হামলার সময় ওই চারজন পবন কুমারের বাড়িতে ঢুকে গুলি চালিয়েছিল বলে অভিযোগ। গুলিতে পবন কুমার নিহত হন। তার ভাই অশোক কুমারও গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন।

এরপর, গত ১২ আগস্ট ১৯৯৯ সালের একটি অপহরণ ও হত্যা মামলায় শাহনওয়াজ নামে এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেন বিচারক দিওয়াকর। মামলায় তাঁকে কাঠ ব্যবসায়ী সালিমকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ১৯৯৯ সালে সালিমকে ৫ লাখ রুপি মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করা হয়েছিল। পরে ওই বছরের ৯ ডিসেম্বর চাপার এলাকার একটি জঙ্গলে তাঁর গলা কেটে তাকে হত্যা করা হয়।

এরও আগে, গত ১৭ জুলাই শামলি জেলায় ২০১১ সালে ডাকাতির চেষ্টার সময় এক কৃষককে হত্যার মামলায় চারজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন বিচারক দিওয়াকর। মামলার তথ্য অনুযায়ী, কৃষক রাজ সিং ২০১১ সালের ২০ আগস্ট তাঁর বন্ধু বিজেন্দ্রকে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে বোনের বাড়িতে যাচ্ছিলেন। পথে অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজন তাদের আটক করে ডাকাতির চেষ্টা করে। রাজ সিং এতে বাধা দিলে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁর বন্ধু বিজেন্দ্রকে বেঁধে কাছের একটি আখখেতে ফেলে দেওয়া হয়।

৬ জুলাই ২০১০ সালের একটি হত্যা মামলায় সাবেক এক গ্রামপ্রধান ও তার সহযোগীকে মৃত্যুদণ্ড দেন বিচারক দিওয়াকর। আদালত জানায়, মামলাটি ‘বিরলতমের মধ্যে বিরল’ শ্রেণির। মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের ২৪ আগস্ট পঞ্চায়েত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শত্রুতার জেরে ৬০ বছর বয়সী রাজবীর সিংকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সাবেক গ্রামপ্রধান প্রমোদ এবং তার সহযোগী সহদেবকে পরে গ্রেপ্তার করা হয়।

গত ২ জুলাই বিচারক রবি কুমার দিওয়াকর দায়িত্ব পালনরত এক হোমগার্ডকে হত্যার মামলায় দীপক নামে এক ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। আদালত মামলাটিকে ‘বিরলতমের মধ্যে বিরল’ শ্রেণির বলে উল্লেখ করে। বিচারক বলেন, এমন পরিস্থিতিতে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছিল, যার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়। ঘটনাটি ঘটে ২০২০ সালের ৪ জুন। ওই সময় হোমগার্ড রতীরাম দায়িত্ব পালন করছিলেন। অভিযুক্ত দীপক তার মাকে মারধর করলে রতীরাম তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে দীপক রতীরামকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে।

এ ছাড়া, গত ২০ জুন রাজেন্দ্র সাইনি হত্যা মামলায় গজেন্দ্র ও রামকিরণ নামে দুই ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেন বিচারক দিওয়াকর। আদালত পর্যবেক্ষণ করে, মামলাটি ‘বিরলতমের মধ্যে বিরল’ শ্রেণির। ৩০ মে বিচারক দিওয়াকরের ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত প্রায় ১৫ বছর আগের একটি জোড়া হত্যা মামলায় ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ওই ব্যক্তি এক নারী ও তাঁর ছয় বছরের ছেলেকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। আদালত পর্যবেক্ষণ করে, মামলাটি ‘বিরলতমের মধ্যে বিরল’ শ্রেণির এবং এতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। নিহতরা হলেন ৩০ বছর বয়সী রাজেশ দেবী ও তার ছয় বছরের ছেলে হিমাংশু। ২০১১ সালের ৭ নভেম্বর মুজাফফরনগর জেলায় তাদের হত্যা করা হয়।

প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, রাহিস নামে ওই ব্যক্তি একটি ঝগড়ার পর রাজেশ দেবী ও তার শিশুসন্তানকে কাছের একটি আখখেতে নিয়ে যান। সেখানে ইট দিয়ে বারবার আঘাত করে তাদের হত্যা করা হয়। ১৩ নভেম্বর তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গত ২৮ এপ্রিল বিচারক দিওয়াকর ২০১৯ সালের একটি হত্যা মামলায় এক নারী ও তাঁর তিন ছেলেকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

৬ এপ্রিল মুজাফফরনগরের ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত ২০১৯ সালে এক আইনজীবীকে অপহরণ ও হত্যার মামলায় তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর ৪৫ লাখ রুপির আর্থিক বিরোধের জেরে আইনজীবী মোহাম্মদ সামিরকে অপহরণ করা হয়। পরে তাঁকে হত্যা করা হয়। তদন্তের সময় পুলিশ জানতে পারে, আসামিরা তাদের একজনের সহায়তায় মরদেহটি অন্য একটি স্থানে নিয়ে ফেলে দিয়েছিল। পরে সিকরি গ্রামের একটি বনাঞ্চল থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।

গত চার মাসে একের পর এক মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর বিচারক রবি কুমার দিওয়াকরের আদালতে বিচারাধীন প্রায় ১০০টি হত্যা মামলা এখন জেলা ও সেশনস জজ বীরেন্দ্র কুমার সিংয়ের আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে। মামলাগুলোতে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রমোদ ত্যাগীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিচারক দিওয়াকরের আদালতে মামলাগুলোর বিচার চলাকালে আইনজীবী ও মামলার পক্ষগুলোর মধ্যে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ফলে এসব মামলার বিচার এখন অন্য আদালতে চলবে।