ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে একটি লজে আগুনে ৭ বাংলাদেশিসহ নয়জনের মৃত্যু হয়। সেই ঘটনার এক সপ্তাহ পরও কলকাতার ওই এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। একসময় যেখানে সারাক্ষণ মানুষের ভিড় ও ব্যস্ততা থাকত, এখন সেখানে নেমে এসেছে এক ধরনের নীরবতা। আগুনের ঘটনার পর একের পর এক হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ, নেপাল এবং ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষজন আবাসন নিয়ে চরম সমস্যায় পড়েছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।
অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মরদেহ বাংলাদেশে দাফনের জন্য পাঠানোর আগেই কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সরাইখানা, লজ, গেস্টহাউস ও হোটেল বন্ধ করতে শুরু করে। অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ অনেক সময় স্পষ্টভাবে কারণ জানায়নি। এমনকি সংশোধনের জন্য পর্যাপ্ত সময়ও দেওয়া হয়নি। এর ফলে এসব হোটেলে থাকা শত শত বাংলাদেশি হঠাৎ করেই রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হন এবং থাকার জন্য মরিয়া হয়ে নতুন কক্ষ খুঁজতে শুরু করেন।
মার্কুইস স্ট্রিটে শ্যামলী পরিবহনের ব্যবস্থাপক মনোরঞ্জন রায় বলেন, ‘এই (গত) সোমবারই ২০০ টির বেশি হোটেল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মধ্য কলকাতা এলাকার আরও কয়েকটি হোটেলও বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজারের বেশি কক্ষ এখন আর ব্যবহার করা যাচ্ছে না। আবাসনের অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষের সংখ্যা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। এখন শুধু জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনেই মানুষ আসছেন। ঢাকা থেকে আসা বাসগুলো অর্ধেক খালি থাকছে, অথচ ফেরার বাসগুলো যাত্রীতে পরিপূর্ণ।’
সুদ্দার স্ট্রিটের জনপ্রিয় খাবারের দোকান ব্লু স্কাই ক্যাফেতেও এর প্রভাব স্পষ্ট। মঙ্গলবার ক্যাফেটি প্রায় খালি ছিল। সেখানে এক কর্মী বলেন, ‘প্রথমে মহামারি পশ্চিমা পর্যটকদের নিয়ে গেছে। এখন হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশিরাও আসছেন না।’
ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের প্রিন্স রেস্টুরেন্টেও একই চিত্র। বাংলাদেশি খাবারের জন্য পরিচিত এই রেস্টুরেন্টে সাধারণত দুপুর ও রাতের খাবারের সময় দীর্ঘ লাইন থাকে। কিন্তু বর্তমানে সেখানে ক্রেতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থাপক চয়ন সাহা বলেন, ‘আমাদের বিক্রি ৩০ শতাংশ কমে গেছে। তবে আমরা পরিস্থিতি সামলে নেব। এই সমস্যার মধ্যে আটকে পড়া বাংলাদেশি রোগীদের জন্য আমাদের খুব খারাপ লাগছে। পুরো এলাকাটির অর্থনীতি বাংলাদেশিদের ওপর নির্ভরশীল। হয়রানির কারণে তারা যদি আসা বন্ধ করে দেন, তাহলে পুরো এলাকার অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
গত ছয় দিনে কেন্দ্রীয় কলকাতার আরও বেশ কয়েকটি লজ, গেস্টহাউস ও হোটেল নিজেরাই কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন এবং দমকল বিভাগের পক্ষ থেকে হঠাৎ করে বন্ধের নোটিশ আসতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। যে ভবনের ফ্লোরেন্স ম্যানশনে আগুন লেগে নয়জন অতিথির মৃত্যু হয়েছিল, সেটিও এখনো সিলগালা অবস্থায় রয়েছে।
মার্কুইস স্ট্রিট, সুদ্দার স্ট্রিট ও ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের বড় হোটেলগুলোর মধ্যে হোটেল ক্রিস্টাল, হোটেল ওয়ালসন, গোল্ডেন অ্যাপল এবং হোটেল ওরিয়েন্টালও বন্ধ রয়েছে। বড় হোটেলগুলোর মধ্যে শুধু অ্যাস্টোরিয়া হোটেল চালু ছিল। তবে মঙ্গলবার কক্ষের সংকটের কথা জানিয়ে হোটেলটি বহু গ্রাহককে ফিরিয়ে দিয়েছে। পুরুলিয়া থেকে ১০ সদস্যের পরিবার নিয়ে মার্কুইস স্ট্রিটে আসা তাপী নাথ বলেন, ‘এলাকার অন্তত ২০টি হোটেল থেকে আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত হোটেল খুঁজতে আমরা হাওড়া স্টেশনে চলে যাই।’
অগ্নিকাণ্ডের পর নিরাপত্তার নামে হোটেল বন্ধের ধারাবাহিকতায় শুধু বাংলাদেশি রোগী ও পর্যটকরাই আবাসন সংকটে পড়েননি, কলকাতার কেন্দ্রীয় এলাকার বহু ব্যবসাও সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশিদের যাতায়াত কমে যাওয়ায় হোটেল, রেস্টুরেন্ট, পরিবহনসহ পুরো স্থানীয় অর্থনীতিতেই এর প্রভাব পড়ছে।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া