হোম > বিশ্ব > ভারত

কলকাতায় হোটেলে আগুন: মালিকেরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

কলকাতার একটি হোটেলে আগুন লেগে অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। ছবি: সংগৃহীত

কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটে একাধিক হোটেল ও গেস্টহাউস থাকা এক ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নয়জনের মৃত্যুর পরও ভবনের মালিক এবং সেখানে পরিচালিত হোটেল-গেস্টহাউসগুলোর মালিকদের সন্ধান মিলছে না। এই ঘটনার পর তাঁরা কেউ ফোন ধরছেন না, আবার কারও মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এতগুলো মানুষ প্রাণ হারানোর ঘটনায় মালিকদের ভূমিকা, ভবনটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং হোটেল পরিচালনার অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য স্টেটসম্যানের খবরে বলা হয়েছে, আজ বুধবার ভোরের ওই আগুনে নিহত নয়জনের মধ্যে দুই নারী ও এক শিশু রয়েছে। পুলিশ ও পশ্চিমবঙ্গ ফায়ার অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সার্ভিসেস বিভাগের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, আগুনে পুড়ে নয়জনের মৃত্যু হয়নি। ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে।

ঘটনার তদন্তে কলকাতা পুলিশ পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত দল বা সিট গঠন করেছে। শহর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের একজন ডেপুটি কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তা দলটির নেতৃত্ব দেবেন। ভবনটির আওতাধীন নিউ মার্কেট থানায় পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মামলা করেছে। রাজ্য দমকল দপ্তরও আলাদা অভিযোগ দায়ের করেছে।

মালিকদের খোঁজ মিলছে না

অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই ভবনের মালিক এবং সেখানে পরিচালিত হোটেল ও গেস্টহাউসগুলোর মালিকরা যোগাযোগের বাইরে রয়েছেন। হোটেলের কর্মী ও কেয়ারটেকাররা জানিয়েছেন, মালিকদের কেউ মোবাইল ফোন বন্ধ করে দিয়েছেন, আবার কেউ ফোন করলেও সাড়া দিচ্ছেন না।

নয়জনের মৃত্যুর পর মালিকদের এভাবে যোগাযোগের বাইরে থাকা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই তদন্তের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ, একই ভবনের বিভিন্ন তলায় আলাদা আলাদা হোটেল ও গেস্টহাউস পরিচালিত হচ্ছিল। ভবনটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ এবং এসব প্রতিষ্ঠান কীভাবে পরিচালনার অনুমতি পেয়েছিল, তা এখন তদন্তের আওতায় আসছে।

ভবনে ছিল সরু পথ, ছিল না জরুরি সিঁড়ি

দমকল ও জরুরি পরিষেবা দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, ভবনের প্রতিটি তলায় আলাদা হোটেল বা গেস্টহাউস ছিল। কিন্তু চলাচলের পথ এতটাই সরু যে দুজন মানুষ পাশাপাশি হাঁটতে বা দাঁড়াতেও পারেন না। ভবনটিতে জরুরি অবস্থায় বের হওয়ার জন্য বাইরের কোনো সিঁড়িও ছিল না।

কৌশিক চৌধুরী প্রশ্ন তুলেছেন, এমন একটি ভবনে কীভাবে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল এবং হোটেলগুলো চালানোর অনুমতি মিলেছিল। তিনি পরে মুখ্যমন্ত্রী সুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। এরপর ওই এলাকার হোটেল, লজ ও গেস্টহাউসগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ অডিট করার সিদ্ধান্ত নেয় রাজ্য সরকার। চৌধুরী বলেন, এ বিষয়ে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে এবং নিয়ম ভঙ্গ করা কোনো প্রতিষ্ঠানকে ছাড় দেওয়া হবে না।

অনুমতি দিয়েছিল কারা, প্রশ্ন মন্ত্রীর

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নগর উন্নয়ন ও পৌর বিষয়ক মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও হোটেলগুলোর অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ন্যূনতম অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও দমকল বিভাগ কীভাবে হোটেল চালানোর অনুমতি দিল। সিইএসসি লিমিটেড কীভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দিল এবং কলকাতা পুরসভার কর্মকর্তারা কী করছিলেন, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

একই ভবনে এতগুলো হোটেল ও গেস্টহাউস কীভাবে চলছিল এবং এসি লাগানো কক্ষগুলোতে কীভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছিল, তাও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান পাল।

আগের অগ্নিকাণ্ডের পরও অডিট শেষ হয়নি

এই ঘটনায় ২০২৫ সালের এপ্রিলের রিতুরাজ হোটেল অগ্নিকাণ্ডের পর শুরু হওয়া নিরাপত্তা অডিটের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ওই আগুনে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এরপর কলকাতা পুরসভা এলাকার হোটেলগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনার জন্য তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকার একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছিল। কিন্তু রাজ্য দমকল বিভাগের এক কর্মকর্তার দাবি, জনবলের ঘাটতি এবং নানা কারণে সেই অডিট মাঝপথে থেমে যায়।

কমিটি চারটি বৈঠক করলেও কলকাতা পুরসভা বা রাজ্য দমকল দপ্তরে কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি। কর্মকর্তা আরও জানান, জনবল বাড়ানো ও নতুন কর্মী নিয়োগের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের অনুরোধ করা হলেও সেই অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, অডিটটি শেষ করা গেলে মির্জা গালিব স্ট্রিটের বর্তমান অগ্নিকাণ্ডে নয়জনের প্রাণহানি হয়তো এড়ানো সম্ভব হতো।