পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জয়যাত্রা যখন সাফল্যের শিখরে, তখন তাঁর ব্যক্তিগত বৃত্তে ঘটে যাওয়া একগুচ্ছ অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে নতুন করে দানা বাঁধছে রহস্য। ২০১৩ থেকে ২০২৬— এই ১৩ বছরের ব্যবধানে শুভেন্দুর অত্যন্ত বিশ্বস্ত অন্তত চারজন ছায়াসঙ্গী বা দেহরক্ষীর মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার রাতে মধ্যমগ্রামে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী চন্দ্রনাথ রথের নৃশংস হত্যাকাণ্ড এই রহস্যের তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন।
চলতি মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মধ্যমগ্রামের দোহারিয়া অঞ্চলে বাড়ি ফেরার পথে আততায়ীদের গুলিতে প্রাণ হারান ৪২ বছর বয়সী চন্দ্রনাথ রথ। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, এটি কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, বরং অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং পেশাদার খুনিদের কাজ। সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, হামলাকারীরা অন্তত ৭২ ঘণ্টা ধরে ওই এলাকায় ‘রেকি’ করেছিল। বাইকে চড়ে আসা দুষ্কৃতকারীরা চলন্ত গাড়িতে খুব কাছ থেকে অন্তত তিনটি গুলি চালায়, যা চন্দ্রনাথের মৃত্যু নিশ্চিত করে। গাড়ির চালক বুদ্ধদেব বেরাও এই হামলায় আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
চন্দ্রনাথের মৃত্যু প্রথম নয়। গত এক দশকে শুভেন্দুর ঘনিষ্ঠ মহলে ঘটে যাওয়া অন্য ঘটনাগুলোও এখন জনসমক্ষে উঠে আসছে:
১. প্রদীপ ঝা (২০১৩): ২০১৩ সালে শুভেন্দুর তৎকালীন আপ্তসহায়ক (ব্যক্তিগত সহকারী) প্রদীপ ঝা-র দেহ কলকাতার স্ট্র্যান্ড রোডে উদ্ধার হয়। পুলিশ মদ্যপানজনিত সমস্যার কথা বললেও, পরিবার শুরু থেকেই এটিকে হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে আসছিল। ২০১১-র নির্বাচনে নন্দীগ্রাম ও হলদিয়ায় শুভেন্দুর জয়ের নেপথ্যে প্রদীপ ছিলেন অন্যতম কারিগর।
২. শুভব্রত চক্রবর্তী (২০১৮): শুভেন্দুর তৎকালীন দেহরক্ষী তথা রাজ্য সশস্ত্র পুলিশের কনস্টেবল শুভব্রত চক্রবর্তী কান্তির পুলিশ ব্যারাকে নিজের সার্ভিস রিভলবার থেকে গুলি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বলে দাবি করা হয়। পরে কলকাতার হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। ২০২১ সালে শুভব্রতর স্ত্রী পুনরায় তদন্তের দাবি জানালে সিআইডি মামলাটি নতুন করে হাতে নেয়।
৩. পুলক লাহিড়ী (২০২১): ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামের গণনার এজেন্ট ছিলেন পুলক। নির্বাচনের ঠিক পরেই রহস্যজনকভাবে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। তৎকালীন রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহে এই মৃত্যুটি সেভাবে সংবাদ শিরোনামে না এলেও, চন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর সেই বিতর্ক আবার মাথাচাড়া দিয়েছে।
রাজনৈতিক চাপান-উতোর ও ‘আলামত নষ্ট’র তত্ত্ব
শুভেন্দু অধিকারী এই ঘটনাকে সরাসরি ‘রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, ভবানীপুর ও নন্দীগ্রামে পরাজয়ের প্রতিহিংসা নিতেই তাঁর সহযোগীদের লক্ষ্য করা হচ্ছে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি— এই ছায়াসঙ্গীরা শুভেন্দুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অনেক ‘গোপন তথ্য’ জানতেন। সেই তথ্য যাতে ফাঁস না হয়, তার জন্যই কি তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে? এমন প্রশ্নও তুলছেন বিরোধীরা।
বিগত বছরগুলোতে হওয়া মৃত্যুগুলোর কোনোটিরই রহস্য আজ পর্যন্ত পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। বেশির ভাগ মামলা আত্মহত্যা বা দুর্ঘটনা বলে ধামাচাপা পড়ে গেছে। তবে সর্বসাম্প্রতিক খুনের ঘটনায় পুলিশ ইতিমধ্যেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘ক্লু’ পাওয়ার দাবি করেছে।
রাজ্যের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীর শপথের আনন্দের মাঝেই তাঁর সহযোগীদের এই অকাল মৃত্যুমিছিল এক অশুভ সংকেত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখন দেখার বিষয়, নতুন সরকারের স্বরাষ্ট্র দপ্তর এই রহস্যের জাল ছিঁড়তে পারে কি না বা আদৌ রহস্য উন্মোচনের আগ্রহ দেখায় কিনা!