দিল্লির যন্তর মন্তর। ১৮ শতকের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মানমন্দির। একই সঙ্গে ভারতের রাজধানীর সবচেয়ে পরিচিত প্রতিবাদস্থলগুলোর একটি। গত ১০ দিন ধরে এখানে দিন-রাত অবস্থান করছেন শত শত শিক্ষার্থী, তরুণ পেশাজীবী ও আন্দোলনকর্মী।
সেখানেই মাথার ওপর তীব্র রোদ নিয়ে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশের তাপমাত্রার মধ্যে তরুণ-তরুণীরা দল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ বসে আছেন, কেউ আবার উত্তপ্ত রাস্তার ওপরই ঘুমিয়ে পড়েছেন। চারপাশ ঘিরে রাখা হয়েছে দিল্লি পুলিশের বসানো ভারী হলুদ ধাতব ব্যারিকেড দিয়ে।
প্রতিবাদী নেতারা পালা করে মাইক্রোফোনে বক্তব্য দিচ্ছেন। আর জনতা স্লোগান দিচ্ছে, বিদ্রোহী বলিউড গান গাইছে। পুরো পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা।
নিজেদের পরিচয় তারা দেয় ‘তেলাপোকা’ হিসেবে। তারা একটি অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনের অংশ, যার নাম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। তাদের দাবি, মেডিকেলে ভর্তিচ্ছুদের গুরুত্বপূর্ণ ভর্তি পরীক্ষা ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (আন্ডারগ্র্যাজুয়েট) বা নিট-ইউজির (NEET-UG) প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে। মে মাসের শুরুতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পরীক্ষাটি বাতিল করা হয়। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, এ ঘটনার নৈতিক দায় শিক্ষামন্ত্রীকে নিতে হবে এবং তাঁর পদ ছাড়তে হবে।
গত সপ্তাহের রোববার আন্দোলন আরও তীব্র হয়। কারণ, দূরবর্তী হিমালয় অঞ্চল থেকে আসা পরিচিত জলবায়ু আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুক আন্দোলনে যোগ দেন এবং অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন। মে মাসের মাঝামাঝি সিজেপির উত্থান ঘটে। এর পেছনে ছিল ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্য, যা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি বেকার কিছু তরুণদের সাংবাদিক ও আন্দোলনকর্মী হওয়ার প্রবণতাকে ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেন। পরে বিচারপতি বলেন, তিনি সাধারণ তরুণদের নয়, বরং ‘ভুয়া ও জাল ডিগ্রিধারী’ ব্যক্তিদের কথা বলেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে প্রতিক্রিয়া অনেক দূর ছড়িয়ে পড়ে।
এই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় মুখ সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। তাঁর বয়স ৩০ বছর। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে জননীতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী। বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘আমি তখন জিম থেকে ফিরেছি। বাসায় বসে পিএস৫-এ ফিফা খেলছিলাম। তখনই প্রধান বিচারপতির মন্তব্যটা দেখি।’ তিনি বলেন, ‘মন্তব্যটা আমাকে কিছুটা হতাশ ও বিস্মিত করে। তারপর আমি এক লাইনের একটা পোস্ট করি এক্সে—‘সব তেলাপোকা যদি এক হয়ে যায়, তাহলে কেমন হয়?’
দীপকের পোস্টে কয়েক লাখ ভিউ ও প্রতিক্রিয়া আসে। তাঁর ভাষায়, ‘বিশেষ করে জেন-জেডদের কাছ থেকে।’ তিনি বলেন, ‘অনেক মিম, রসিকতা আর মন্তব্য আসতে থাকে। অনেকে লিখতে শুরু করে যে আমাদের নিজেদের একটা প্ল্যাটফর্ম হওয়া উচিত, এমনকি নিজেদের একটা দলও। তখন ভাবলাম, কেন নয়? একটু পাগলামিই করা যাক।’
একটি এআই প্রম্পট তাঁকে একটি লোগো ও একটি মাসকট তৈরি করে দেয়। স্যুট পরা একটি তেলাপোকা। এভাবেই জন্ম হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির। নামটি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) ব্যঙ্গ করে রাখা। কয়েক দিনের মধ্যেই সিজেপি মিম ও হাস্যরসের প্ল্যাটফর্ম থেকে বদলে তরুণদের উদ্বেগ প্রকাশের জায়গায় পরিণত হয়। সেখানে উঠে আসে চাকরির সংকট, বারবার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ক্ষমতাসীনদের কাছে জবাবদিহির দাবি।
দীপকে বলেন, ‘এর কোনোটাই পরিকল্পিত ছিল না। এটা শুধু ব্যঙ্গ হিসেবে শুরু হয়েছিল। কিন্তু লাখ লাখ মানুষ যুক্ত হতে শুরু করার পর তারা বলতে থাকে, এটাকে আমরা একটি সিরিয়াস আন্দোলনে রূপ দিতে চাই। কারণ অন্য কোনো রাজনৈতিক দল আমাদের প্রয়োজন, আশা বা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কথা বলছে না। সমর্থকরাই আমাকে অনেকটা বাধ্য করেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যেহেতু তরুণদের আন্দোলন, তাই প্রথমে তরুণদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিই নিয়েছি। বছরের পর বছর আমরা দেখেছি কত পরীক্ষা বাতিল হয়েছে, অথচ ব্যবস্থা ঠিক করার বা দায় নেওয়ার মতো কাউকে দেখা যায়নি।’
সিজেপি কোনো রাজনৈতিক দল নয়। এর নেতাদের মধ্যেও এটিকে রাজনৈতিক দলে রূপ দেওয়ার লক্ষণ দেখা যায় না। তবে তাদের বিশাল অনলাইন অনুসারী, ইনস্টাগ্রামে ২ কোটি ২০ লাখ অনুসারী, বাস্তবের মাঠে সমর্থনে রূপ নেবে কি না, সেটাও পরিষ্কার নয়।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে সিজেপির প্রথম কর্মসূচিও হয়েছিল ৬ জুন জন্তর মন্তরে। বোস্টন থেকে ফেরার পরপরই সেই কর্মসূচি করেন দীপকে। তাঁর দেশে ফেরা এবং প্রতিবাদের পরিকল্পনা ব্যাপক প্রচার পায়। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, পুলিশ তাঁকে অংশ নিতে দেবে না। দীপকে বলেন, ‘আমিও ভাবিনি আমাকে বিমানবন্দর থেকে বের হতে দেওয়া হবে। আমি ধরে নিয়েছিলাম আমাকে গ্রেপ্তার করা হবে।’ তিনি জানান, বিমানের ভেতরেই পুলিশ তাঁর আসনের কাছে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁকে যেতে দেওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি যন্তর মন্তরে গিয়ে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
এরপর সিজেপি অর্ধডজনের মতো শহরে কর্মসূচি করেছে। তারপর গত সপ্তাহে আবার জন্তর মন্তরে ফিরে এসেছে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে। এবার আয়োজকদের ঘোষণা, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা সরে যাবে না। ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি সিজেপি ও তাদের সমর্থকদের ‘বিশৃঙ্খলাকারী গোষ্ঠীর বি-টিম’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর দাবি, এরা ‘দেশের অগ্রগতিতে বিশ্বাস করে না।’
বিজেপির সভাপতি নিতিন নবীনও এই গোষ্ঠীকে আক্রমণ করেন। তিনি বলেন, ‘নতুন ভাইরাস এবং তেলাপোকা ধরনের দল’ তৈরি হচ্ছে, যাদের লক্ষ্য ‘দেশকে ধ্বংস করা’ এবং ‘টুকরো টুকরো করা।’
গত ২১ জুন সরকার নিট-ইউজির পুনঃপরীক্ষা নিয়েছে। কিন্তু এতে যন্তর মন্তরের ক্ষোভ কমেনি। দীপকে বলেন, ‘সরকার যদি একগুঁয়ে হয়, আমরা তার চেয়েও বেশি একগুঁয়ে।’ প্রতিবাদস্থলে কয়েক মিনিট পরপরই শোনা যায়, ‘প্রধান, ফিরে যাও।’
একটি হলুদ ত্রিপলের নিচে তৈরি করা হয়েছে স্মৃতিদেয়াল। সেখানে রাখা হয়েছে সেই শিক্ষার্থীদের স্মরণ, যাদের পরিবার বলছে, নিট-ইউজি প্রথমবার বাতিল হওয়ার পর তারা আত্মহত্যা করেছে। এক স্বেচ্ছাসেবক লোহার দণ্ড দিয়ে ত্রিপল তুলে ধরেন। তখন দেখা যায় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের ১৪ শিক্ষার্থীর নাম ও ছবি।
সিজেপির প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেন, এই সংখ্যা এখন প্রায় ২০-এ পৌঁছেছে। ছবির নিচে লেখা রয়েছে শত শত সংহতির বার্তা। একটি বার্তায় হিন্দিতে লেখা ছিল, ‘আমরা যদি না লড়ি, তাহলে কে লড়বে? আমরা যদি না বলি, তাহলে কে বলবে?’ ছবিগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে স্কুলশিক্ষক শীতল চৌধুরী বলেন, এসব শিক্ষার্থীর পরিবার পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ঋণ নিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘তারা সচ্ছল পরিবার থেকে আসেনি। তারা খুব দরিদ্র, খুব প্রান্তিক পরিবার থেকে এসেছে। আমি আমার শ্রেণিকক্ষে এমন শিক্ষার্থীদেরই পড়াই।’
পুলিশে যোগ দেওয়ার আশা নিয়ে পড়াশোনা করা স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী তমন্না কুমারী বলেন, তিনি প্রতিদিন আন্দোলনে আসেন। কারণ, ‘জীবনে প্রথমবার কেউ আমাদের হয়ে কথা বলছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি পুলিশ নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে আমার ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাবে কি না, সেই ভয় সব সময় থাকে।’ এক হাতে সিজেপির পতাকা, অন্য হাতে ভারতের জাতীয় পতাকা ধরে তমন্না তাঁর লক্ষ্য স্পষ্ট করে বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতেই হবে।’
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে জন্তর মন্তরে জনসমাগম আরও বাড়তে থাকে। সৌরভ দাস বলেন, ‘দিন দিন আন্দোলন বড় হচ্ছে। গতি শক্তিশালী হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘ছাত্রসংগঠন ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো আমাদের সমর্থন করছে। মানুষ খাবার ও পানি পাঠাচ্ছে। প্রতিদিন সকালে পরিচিত মানুষ থেকে শুরু করে অচেনা মানুষ পর্যন্ত বার্তা পাঠায়, কীভাবে সাহায্য করতে পারে জানতে চায়।’
রোববার হাজারো মানুষ জড়ো হয় সোনম ওয়াংচুককে স্বাগত জানাতে। লাদাখের এই সম্মানিত শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মী একটি জনপ্রিয় বলিউড চলচ্চিত্রের অনুপ্রেরণাও ছিলেন। অনশন শুরু করে তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘শিক্ষাব্যবস্থায় বিশাল সমস্যা আছে। কিন্তু এখন তো পরীক্ষাগুলোও ব্যর্থ হচ্ছে। আমি এই তরুণদের আন্দোলনে পাশে দাঁড়াতে এসেছি, যাতে শিক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা হয় এবং শিক্ষামন্ত্রী দায় নেন।’ তবে তাঁর অভিযোগ, ‘সরকার সাড়া দিচ্ছে না, সংবেদনশীলও নয়।’
৪০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রায় কত দিন অনশন চালাতে পারবেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এখন তো শুরুর সময়, তাই সমস্যা নেই। কিন্তু আমি স্বাস্থ্য নিয়ে খুব বেশি ভাবি না। মৃত্যু কিংবা এই অনির্দিষ্ট অনশনগুলোর ধারাবাহিকতা, যেটা আগে আসে।’
অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা বলছেন, ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা ফিরবেন না। সৌরভ দাসের ভাষায়, প্রধানের পদত্যাগ ‘শুধু একটি লড়াই, আসল লড়াই কয়েক দিন, কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসে জেতা যেতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা এখানে মাঠে আছে, আর যারা অনলাইনে আমাদের সমর্থন করছে, সবাই জানে এটা একটা যুদ্ধ। আর যুদ্ধ অল্প সময়ে জেতা যায় না।’ তাঁর ভাষায়, সেই লক্ষ্য হলো ‘একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, দায়িত্বশীল ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আর এটা দীর্ঘ পথের সংগ্রাম।’