সপ্তাহখানেক আগে ভারতের জয়পুরে অনলাইন খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সুইগির ডেলিভারি বয় আফতাব খানের স্মার্টফোনের স্ক্রিনে একটি অদ্ভুত নির্দেশিকা ভেসে ওঠে। সেখানে লেখা ছিল—‘কোনো মুসলিম ডেলিভারি বয় পাঠাবেন না’।
পেশায় ডেলিভারি বয় হলেও আফতাবের আরেকটি পরিচয় আছে। তিনি একজন উদীয়মান র্যাপার, ভারতীয় সংগীতাঙ্গনে যিনি ‘রকিং আফতাব’ নামে পরিচিত। এমন সাম্প্রদায়িক লেখা দেখে তিনি চাইলে অর্ডারটি বাতিল করতে পারতেন কিংবা স্থানীয় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে অন্য কোনো ডেলিভারি বয়কে এটি দিয়ে দিতে পারতেন; কিন্তু তিনি তা করেননি।
ঘৃণা উগরে দেওয়া মানুষটির মুখোমুখি হয়েছেন আফতাব। সেই মুহূর্তের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়াকে আফতাব বলেন, ‘একজন মানুষ হিসেবে লেখাটি দেখে আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। কিন্তু আমি এই লেখার পেছনের মানুষটিকে দেখতে চেয়েছিলাম, জানতে চেয়েছিলাম তাঁর মানসিকতা কেমন।’
খাবারের প্যাকেট হাতে নিয়ে বহুতল ভবনের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটের দিকে যখন আফতাব সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলেন, তখন দেশের বর্তমান সংবেদনশীল সামাজিক পরিস্থিতির কথা ভেবে মনের ভেতর একধরনের ভয় কাজ করছিল তাঁর। কিন্তু দরজা খোলার পর যা ঘটল, তা আফতাবের সব আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণিত করে দেয়।
গ্রাহক যখন দরজা খুললেন, তখন তাঁর মুখে ছিল উষ্ণ অমায়িক হাসি। আফতাব নরম সুরে তাঁকে ওই সাম্প্রদায়িক বার্তার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন, মুহূর্তের মধ্যেই ওই ব্যক্তির মুখের ভাব বদলে গেল এবং তিনি চরম লজ্জিত ও বিব্রত হয়ে পড়লেন।
গ্রাহক ব্যাখ্যা করে জানান, এটি আসলে অনেক পুরোনো একটি নির্দেশনা ছিল। জীবনের এক ক্ষুব্ধ মুহূর্তে তিনি লিখে রেখেছিলেন। পরে অ্যাপ থেকে কীভাবে লেখাটি মুছতে হয়, তা তিনি জানতেন না।
আফতাব কোনো তর্ক বা উপদেশ দিতে যাননি। তিনি নিজেই গ্রাহকের ফোনটি হাতে নিয়ে সুইগি অ্যাপের ভেতরে গিয়ে ওই আপত্তিকর লেখাটি ডিলিট করে দেন। তাঁদের মধ্যকার এই ভুল-বোঝাবুঝির অবসান ঘটে একটি উষ্ণ করমর্দন ও এক গ্লাস ঠান্ডা পানি আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে। আফতাব বলেন, ‘মানুষমাত্রই ভুল করে। তিনি আমার কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং এতেই আমার মন হালকা হয়ে গেছে। আমাদের লক্ষ্য তো দেশজুড়ে ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়া, ঘৃণা নয়।’
অতিদরিদ্র ও অর্থনৈতিকভাবে সংকটাপন্ন একটি পরিবারে বড় হয়েছেন আফতাব। তাঁর বাবা একজন সাধারণ সবজি বিক্রেতা। অভাবের কারণে অল্প বয়সেই পড়াশোনায় ইস্তফা দিতে হয়েছিল তাঁকে। রক্ষণশীল পাড়াপড়শিরা শুরুতে তাঁর সংগীতচর্চার স্বপ্ন নিয়ে উপহাস করতেন।
তবু সংগীতই ছিল আফতাবের বেঁচে থাকার রসদ। স্কুলজীবনে ভারতীয় র্যাপসংগীতের উত্থান দেখে ২০১৫ সাল থেকে তিনি নিজে গান লিখতে শুরু করেন। কঠোর পরিশ্রমের ফলস্বরূপ ২০২৪ সালে সুইগির করপোরেট ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতা ‘সুইগি ভিগি’-তে নিজের লেখা মৌলিক গান ‘সুইগিস পার্টনার’ গেয়ে তিনি চ্যাম্পিয়ন হন।
আফতাব বলেন, ‘আমি যে সমাজ থেকে এসেছি, সেখানে স্বপ্ন পূরণ করার চেয়ে স্বপ্ন দেখাটা বেশি কঠিন। বেশির ভাগ মানুষ এখানে স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, কেবল আমার প্রতিভাই আমাকে এই পরিস্থিতি থেকে টেনে তুলতে পারে।’
আফতাবের একটি সাম্প্রতিক র্যাপ গানের লাইনে ফুটে উঠেছে মানবিকতার কথা—
‘রাম নে বোলা নেহি, মারো মুসলমান কো,
আল্লাহ নে ফরমায়া নেহি, মারো ইনসান কো...
জিসনে তুঝে বানায়া, উসনে হি মুঝে বানায়া।’
অর্থাৎ, রাম বা আল্লাহ—কেউই মানুষকে হত্যা করতে বলেননি। যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আমাকে সৃষ্টি করেছেন।
আফতাব জানান, এই একটিমাত্র অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দিয়ে তাঁর নিজের শহর জয়পুরকে বিচার করা ঠিক হবে না। তিনি তাঁর ডেলিভারির কাজ করতে গিয়ে প্রতিদিন মানুষের অগাধ ভালোবাসার মুখোমুখি হন। উদাহরণ হিসেবে তিনি গত বছরের জুলাই মাসের এক বর্ষণমুখর দুপুরের কথা স্মরণ করেন, যখন বৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ভিজে যাওয়া আফতাবকে দেখে একজন সহৃদয় গ্রাহক এক কাপ গরম দুধ খেতে দিয়েছিলেন।
একটি বিদ্বেষপূর্ণ সাম্প্রদায়িক বার্তাকে ধৈর্য ও মুখোমুখি আলাপের মাধ্যমে চমৎকার একটি সম্প্রীতির মুহূর্তে রূপান্তর করে ‘রকিং আফতাব’ প্রমাণ করে দিয়েছেন—সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সব সময় চিৎকার করার প্রয়োজন হয় না, মাঝে মাঝে শান্ত মুখে সততা ও সত্যকে পৌঁছে দেওয়াই যথেষ্ট।