হোম > বিশ্ব > ভারত

সি-মোদি দিল্লিতে হাত মেলালেও অরুণাচলে ভূমি দখলের অভিযোগ চীনের বিরুদ্ধে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত ছবির তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২২ সালের ২ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যে তিব্বতের রাওরাং এলাকায় বিভিন্ন পরিবর্তন ও নতুন অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটেছে। ছবিগুলোতে সামরিক ব্যবহারের উপযোগী হতে পারে এমন আরও কয়েকটি স্থানে নির্মাণকাজ পরিলক্ষিত হচ্ছে; এর মধ্যে একটি অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ এলাকাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ছবি: স্যাটেলাইট চিত্রটি ভ্যান্টরের সৌজন্যে

নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে গতকাল শনিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় সীমান্ত সংঘর্ষের প্রায় সাত বছর পর এটি সি চিন পিংয়ের প্রথম ভারত সফর। বৈঠকে দুই নেতা বাণিজ্য বৃদ্ধি, সরাসরি বিমান যোগাযোগ পুনঃস্থাপন ও সাংস্কৃতিক বিনিময় জোরদারের অঙ্গীকার করেন। তবে এই আলোচনার আবহেই অরুণাচল প্রদেশে চীনা সেনাবাহিনীর ভূখণ্ড দখল ও অবকাঠামো নির্মাণের খবর সামনে এসেছে।

স্যাটেলাইট ইমেজ বা উপগ্রহ চিত্র ও স্থানীয় উপজাতীয় অধিবাসীদের তথ্যের ভিত্তিতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দি ইনডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, বিতর্কিত হিমালয় সীমান্তে ভারতীয় ভূখণ্ডের গভীরে প্রবেশ করে ঘাঁটি নির্মাণ করছে চীন, যা সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।

ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবানসিরি জেলার তাকসিং-গেলেমো সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চলে চীন কিছু সড়ক, হেলিপ্যাড, বহুতল ভবন ও সামরিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ করছে।

ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স সংস্থা জেনসের স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে নিশ্চিত করা হয়েছে, তিব্বতের লহুনজে কাউন্টির ঝারি শহরের কাছে চীন ব্যাপক নির্মাণকাজ চালাচ্ছে। স্যাটেলাইট চিত্রে সড়ক প্রশস্ত করার পাশাপাশি একাধিক নতুন হেলিপ্যাড ও ছাদ-সংবলিত ভবন দেখা গেছে, যা ভারী সামরিক সরঞ্জাম চলাচলের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পিছু হটছে ভারতীয় সেনারা, এগিয়ে আসছে চীন

সীমান্তবর্তী গেলেমো গ্রামের বাসিন্দা তাকোক ম্রা ইনডিপেনডেন্টকে বলেন, ‘চীন এখন আমাদের পূর্বপুরুষের জমি দখল করছে। তারা ভারতীয় ভূখণ্ডের অনেক ভেতরে ঢুকে পড়েছে।’

অল টাগিন স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (এটিএসইউ) ও পাহাড়ি উপজাতি সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটির একটি যৌথ প্রতিনিধিদল এলাকাটি পরিদর্শন শেষে প্রশাসনের কাছে লিখিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। দলনেতা তাদাক পাকবা বলেন, সীমান্তবর্তী গ্রামে শুধু আতঙ্কই তৈরি হয়নি, বাস্তবতা হলো—ভারতীয় সেনারা পিছু হটছে এবং চীনা বাহিনী ক্রমাগত সামনের দিকে এগিয়ে আসছে।

ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভারতের টহল পয়েন্ট ‘শেরা ৫’ ও ‘নাঙ্গা পাহাড়’ অঞ্চলে স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচল এবং ভারতীয় সেনাদের টহল চীনা সেনাবাহিনী বন্ধ করে দিয়েছে। ঐতিহ্যবাহী বুদ্ধপূজার স্থান ‘পোত্রাং লেক’-এ স্থানীয় ‘না’ উপজাতির প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

‘সালামি স্লাইসিং’ কৌশল ও স্থানীয় দুরবস্থা

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) চীনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শ্রীকান্ত কোন্ডাপল্লী ইনডিপেনডেন্টকে বলেন, এটি চীনের পরিচিত ‘সালামি স্লাইসিং’ কৌশলের অংশ। এ প্রক্রিয়ায় তারা ধাপে ধাপে জমি দখল করে স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলে।

অধ্যাপক শ্রীকান্ত জানান, চীন সীমান্তে ১০০টির বেশি মডেল ভিলেজ বা শিওকাং তৈরি করে তাদের অবস্থান জোরদার করেছে। কিন্তু ভারতের ‘ভাইব্র্যান্ট ভিলেজ’ কর্মসূচি পরিকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার অভাবে সফল হতে পারেনি। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে ভারত সীমান্ত পর্যন্ত নিয়মিত পৌঁছাতে পারছে না আর বেইজিং সেই সুযোগেরই ব্যবহার করছে।

দুই দেশের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া

চীনা অনুপ্রবেশের ঘটনা নিয়ে ভারতে বিতর্ক তৈরি হলেও ভারতীয় সেনাবাহিনী ও অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু নতুন করে অনুপ্রবেশের তথ্যকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘সীমান্ত পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করবে আমাদের সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ।’

অন্য দিকে, বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, বর্তমানে চীন-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি মোটের ওপর স্থিতিশীল রয়েছে।

মজার বিষয় হলো, গতকাল শনিবার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার অংশ হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে মোদি-সি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে ২০২০ সালের হিমালয় সীমান্ত সংঘাত-পরবর্তী জটিলতা কাটিয়ে দুই নেতা সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন। কিন্তু বৈঠকে সম্পর্ক স্বাভাবিকের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটারের অনির্ধারিত সীমান্তে চীনের সামরিক কর্মকাণ্ড চলমান রয়েছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধারাবাহিক অগ্রগতির জন্য সীমান্ত এলাকায় স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কথা বলেছেন, কিন্তু তাঁর সরকার জানেই না চীন অরুণাচল সীমান্তে তাদের জমি দখল করছে।