ভারতের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এরপরেই পাটনার বাঁকিপুর বিধানসভা উপনির্বাচন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে বিজেপি শিবিরে। কারণ এই নির্বাচন এখন বিজেপির মর্যাদার লড়াই, জন সুরাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোরের রাজনৈতিক প্রভাবের পরীক্ষা এবং সর্বোপরি বিহারের জেন-জি বা তরুণ ভোটারদের ভূমিকা প্রমাণের একটি বড় ক্ষেত্র।
বাকিপুর দীর্ঘকাল ধরেই বিজেপির একটি শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। নিতিন নবীন এই আসন থেকে বেশ কয়েকবার জয়লাভ করেছিলেন। তিনি বিজেপির জাতীয় সভাপতি নির্বাচিত হয়ে রাজ্যসভায় চলে যাওয়ায় আসনটি শূন্য হয়। এখন কেন্দ্র ও রাজ্য—উভয় দিক থেকেই ক্ষমতাসীন দলের জন্য আসনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এদিকে এই লড়াইকে আরও জমজমাট করে তুলেছেন প্রশান্ত কিশোর। কারণ তিনি নিজে এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন।
জনমিতি ও জেন-জি ফ্যাক্টর
এই নির্বাচনী এলাকার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর তরুণ ভোটারেরা। বাঁকিপুরে রয়েছে প্রচুর কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কোচিং সেন্টার এবং হোস্টেল। পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়, এনআইটি পাটনা, বিএন কলেজ, সায়েন্স কলেজ, এএন কলেজ, চাণক্য ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করতে আসেন।
এ আসনের মোট ৩ লাখ ৭৯ হাজার ভোটারের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৫ হাজার ভোটারই (অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ) ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ, যারা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ইস্যুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই কারণে এবারের নির্বাচনে জেন-জি ভোটারদের একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্প্রতি ছাত্র আন্দোলনের ফলে এই প্রজন্মের ভোটারেরা আগের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানান। এসব প্রতিবাদের সময় পুলিশের পদক্ষেপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়, যা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিশ্বাস, সব রাজনৈতিক দলই এই বিষয়গুলোকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে। বিশেষ করে প্রশান্ত কিশোর, যিনি ধারাবাহিকভাবে এই ইস্যুগুলো তুলে ধরেছেন। তবে বিহারের নির্বাচনী ইতিহাস অনুযায়ী, সব ধরনের আন্দোলন বা ক্ষোভ সব সময় ব্যালটে রূপ নেয় না।
অন্যদিকে বিজেপি এই নির্বাচনে লড়ছে তাদের উন্নয়নের কার্ড, শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠিত ভোট ব্যাংকের ওপর ভর করে। দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর শক্তিশালী বুথভিত্তিক সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক। বাঁকিপুরে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, মধ্যবিত্ত এবং দীর্ঘদিনের বিজেপি সমর্থকদের বেশ ভালো প্রভাব রয়েছে। দলটি উন্নয়ন, সাংগঠনিক শক্তি এবং স্থিতিশীল নেতৃত্বের বিষয়গুলোকে সামনে রেখে নির্বাচন পরিচালনা করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
এর বিপরীতে, তরুণ ভোটারেরা অন্যান্য ভোটারদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা, সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে জোরালো মতামত এবং কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য না থাকা। এই কারণে জেন-জি প্রজন্মকে কোনো দলের নির্দিষ্ট বা নিশ্চিত ভোট ব্যাংক হিসেবে দেখা হচ্ছে না। নির্বাচনের সময় তাদের অবস্থান যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে। সাম্প্রতিক জেন-জি বিক্ষোভই তার প্রমাণ।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং সরকারের তরফ থেকে বেশ কিছু আশ্বাসের পর নিট (এনইইটি) প্রশ্নফাঁস নিয়ে চলা সাম্প্রতিক আন্দোলন স্তিমিত হয়ে গেছে। দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীরা তাঁদের অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই আন্দোলন থেকে তৈরি হওয়া ক্ষোভ কি ভোটের দিন পর্যন্ত বজায় থাকবে, নাকি নির্বাচন শেষ পর্যন্ত চিরায়ত রাজনৈতিক সমীকরণেই ফিরে যাবে? এই পরিস্থিতিতে সবার নজর রয়েছে তরুণ ভোটারদের দিকে। ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী ভোটারদের উপস্থিতি বা টার্নআউট নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলে এবং তার বিপরীতে ঐতিহ্যবাহী ভোট ব্যাংকগুলো কী করতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।