একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির নিজের পছন্দ অনুযায়ী ধর্ম বেছে নেওয়া এবং জীবনসঙ্গী নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। এ পর্যবেক্ষণ দিয়ে গতকাল বুধবার ভারতের উত্তর প্রদেশের শামলি জেলার বাসিন্দা আয়ুষ মালিককে নিজের পছন্দের ধর্ম পালন এবং বৈবাহিক সম্পর্কের বিষয়ে নিজেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন এলাহাবাদ হাইকোর্ট।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়েছে, আয়ুষ এর আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এক মুসলিম নারীকে বিয়ে করেন। তাঁর বাবা তাঁকে আটকে রাখার যে কারণ দেখিয়েছেন, তা শুনে বিচারপতি সন্দীপ জৈনের একক বেঞ্চ বলেন, ছেলের কল্যাণ নিয়ে বাবার উদ্বেগ পারিবারিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে বোধগম্য। তবে শুধু এই উদ্বেগের কারণে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষম ব্যক্তির ধর্ম, বসবাসের স্থান এবং জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করা যায় না।
আয়ুষের বন্ধু সুলতান হাইকোর্টে একটি হেবিয়াস কর্পাস আবেদন করেন। আবেদনে তিনি অভিযোগ করেন, শামলির বাসিন্দা আয়ুষ মালিককে তাঁর বাবা দেবরাজ সিং মালিক রাজ্যের সঙ্গে যোগসাজশ করে বেআইনিভাবে নিজের বাড়িতে আটকে রেখেছেন।
সুলতান তাঁর আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতকে জানান, আয়ুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন এবং চাঁদনী কুরেশিকে বিয়ে করেছেন। আয়ুষের বাবা গত জুনে চাঁদনী ও তার বাবার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধারায় মামলা করেন। এর মধ্যে ধর্মান্তরবিরোধী আইনের ধারাও ছিল। পরে চাঁদনী ও তার বাবাকে কারাগারে পাঠানো হয়। আবেদনের শুনানির সময় গত ৯ সেপ্টেম্বর আদালত মালিক ও রাজ্য সরকারকে ১৬ সেপ্টেম্বর আয়ুষকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন।
আদালতের নির্দেশ মেনে বুধবার শামলি পুলিশ আয়ুষকে আদালতে হাজির করে।
আদালতে বিচারকের সঙ্গে কথা বলার সময় আয়ুষ জানান, তাঁর বয়স প্রায় ৩১ বছর এবং তিনি বি. ফার্মা পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। তিনি বলেন, ২০১৪ সালে তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। কাউকে ভয় দেখানো, হুমকি, অযাচিত প্রভাব, চাপ বা কোনো ধরনের প্রলোভনের কারণে নয়, সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
আয়ুষ আরও জানান, ইসলাম গ্রহণের পর থেকে তিনি ধর্মটির প্রয়োজনীয় রীতিনীতি পালন করে আসছেন। তবে তার এই সিদ্ধান্ত বাবা-মা এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা মেনে নেননি। তিনি আদালতকে বলেন, তিনি চাঁদনী কুরেশিকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তার সঙ্গে বিয়ে সম্পন্ন করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু তার বাবা-মা এই সিদ্ধান্তও মেনে নেননি।
আয়ুষের বক্তব্য অনুযায়ী, চাঁদনী কুরেশিকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তের কারণে গত ৬ জুন শামলি থানায় চাঁদনী কুরেশি ও তার আত্মীয়দের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধারায় এফআইআর করা হয়। এর মধ্যে উত্তরপ্রদেশের বেআইনি ধর্মান্তর নিষিদ্ধকরণ আইনের ধারাও ছিল। আয়ুষ দাবি করেন, চাঁদনী ও তার আত্মীয়দের বিরুদ্ধে হওয়া ফৌজদারি কার্যক্রম তার ওই সিদ্ধান্তেরই পরিণতি।
আয়ুষ আরও আদালতকে জানান, তাকে হুমকি দেওয়া হয় এবং বেআইনিভাবে আটকে রাখা হয়। গত ৪ জুন থেকে তাকে বাড়িতে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন। এরপর হাইকোর্ট আয়ুষের বাবা দেবরাজ সিং মালিকের সঙ্গেও কথা বলে। দেবরাজ তাঁর ছেলের করা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তার ছেলে কিছু মানুষের দ্বারা ‘প্রভাবিত বা ব্রেনওয়াশড’ হয়েছেন এবং তার মতে, আয়ুষ স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেননি।
বাবা ছেলের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এ কারণেই তিনি আয়ুষের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ এবং চাঁদনীকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তে সম্মতি দেননি। তবে আয়ুষ তার বাবার বক্তব্য স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেন। তিনি আদালতের সামনে আবারও বলেন, তার সব সিদ্ধান্ত স্বেচ্ছায়, স্বাধীনভাবে এবং যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করে নেওয়া হয়েছে।
দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর হাইকোর্ট জানায়, স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে যে আয়ুষ প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছেন এবং নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তাঁর রয়েছে। আদালতের আদেশে বলা হয়, আয়ুষ আদালতের সামনে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন এবং এই সিদ্ধান্ত কোনো প্ররোচনা, হুমকি, জবরদস্তি, অযাচিত প্রভাব বা চাপের কারণে নেওয়া হয়নি। আদালত আরও জানায়, আয়ুষ আদালতের সঙ্গে কথা বলার সময় যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা অবিশ্বাস করার মতো কোনো তথ্য বা প্রমাণ আদালতের নথিতে পাওয়া যায়নি।
হাইকোর্ট উল্লেখ করে, ভারতের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে বিবেকের স্বাধীনতা এবং স্বাধীনভাবে ধর্ম গ্রহণ, পালন ও প্রচারের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। আদালত বলে, কোনো ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক হলে সাধারণভাবে নিজের বিবেক অনুযায়ী ধর্ম নির্ধারণ করার অধিকার রাখেন। এটি ব্যক্তিগত স্বায়ত্তশাসন ও বিবেকের স্বাধীনতার প্রকাশ। পরিবারের সদস্যরা সেই সিদ্ধান্ত মেনে না নিলেও শুধু এ কারণে ওই সিদ্ধান্ত বাতিল করা যায় না।
একইভাবে, একজন ব্যক্তি কার সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে চান, সেই ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার অধিকারও সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে আদালত উল্লেখ করে।
আদালত আরও বলে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কাকে বিয়ে করবেন বা কার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করবেন, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত স্বায়ত্তশাসনের বিষয়। পরিবারের ইচ্ছা বা প্রত্যাশার সঙ্গে সেই সিদ্ধান্তের বিরোধ থাকলেও শুধু এই কারণে ওই সিদ্ধান্তের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করার বৈধ ভিত্তি তৈরি হয় না।
আয়ুষকে তাঁর বাড়িতে পুলিশি উপস্থিতির মধ্যে রাখা হয়েছিল এবং মামলায় আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তাকে হাইকোর্টে হাজির করা হয়। বিষয়টি উল্লেখ করে বিচারপতি সন্দীপ জৈন বলেন, আয়ুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর এ ধরনের কোনো বিধিনিষেধ অব্যাহত রাখার বৈধ কারণ আদালত দেখতে পাচ্ছে না। আদালত আরও বলে, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি আদালতের সামনে নিজের স্বাধীন ইচ্ছা ও পছন্দ স্পষ্টভাবে প্রকাশ করলে সাধারণভাবে সেই পছন্দকে সম্মান করতে হবে। তবে আইনে স্বীকৃত কোনো পরিস্থিতির কারণে সেই সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে প্রমাণিত হলে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে।