ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজায় ‘গণহত্যা’ চলাকালে ভারত রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইসরায়েলে অন্তত ২ হাজার ৫৯৬টি চালানে কয়েক লাখ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের নতুন এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশিত হয়। লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, ২০০৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত পাঠানো এসব চালানের মধ্যে ছিল মেশিনগানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, ইসরায়েলের রাষ্ট্র পরিচালিত সমরাস্ত্র প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমসকে সরবরাহ করা ১৫৫ মিলিমিটারের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক কামানের গোলা, খান ইউনিসের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া স্কাইস্ট্রাইকার ‘কামিকাজে’ ড্রোনের বিস্ফোরক ওয়ারহেড এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মূল সরবরাহকারীদের জন্য তৈরি সাঁজোয়া যানের যন্ত্রাংশ।
অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, ভারতের এসব চালানে ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার ৯৭০টি বিস্ফোরক অস্ত্রের যন্ত্রাংশ (যার মধ্যে ড্রোনের ওয়ারহেড ও কামানের গোলার খোলস রয়েছে), সামরিক মানের অস্ত্রের জন্য ৩ লাখ ৯০ হাজার ৫১৬টি ছোট অস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীকে সরবরাহকারী বড় বড় ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানের জন্য পাঠানো ২৯৮টি সামরিক যানের উপাদান।
এর আগে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরু হয়। ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই পর্যন্ত এই অভিযানে অন্তত ২ লাখ ৪৭ হাজার ৩৮৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত বা আহত হয়েছেন।
আজ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ‘মেড ইন ইন্ডিয়া: দ্য সাপ্লাই অব ওয়েপনস অ্যান্ড অ্যামিউনিশন টু ইসরায়েল’—শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের এই অনুসন্ধানের তথ্যগুলো একটি ‘রক্ষণশীল পদ্ধতি’ অনুসরণ করে বের করা হয়েছে। ফলে ইসরায়েলের সামরিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ভারতের প্রকৃত অবদানের পুরো চিত্র এতে না-ও উঠে আসতে পারে এবং মূল পরিমাণ এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।
২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে নয়াদিল্লি ইসরায়েলকে যুদ্ধবিমান, বোমা ও অস্ত্রের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে আসছে বলে যেসব অভিযোগ উঠছিল, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এই প্রতিবেদনটি তারই ধারাবাহিকতা। ২০২৬ সালের মে মাসে ফিলিস্তিনপন্থী ‘বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাংশনস’ (বিডিএস) আন্দোলন এবং ‘নো হারবার ফর জেনোসাইড’ (এনএইচজি) জোট সতর্ক করে জানিয়েছিল যে ভারত থেকে ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জামের এক বিশাল ‘স্রোত’ যাচ্ছে।
সে সময় নো হারবার ফর জেনোসাইডের এক মুখপাত্র মিডল ইস্ট আইকে বলেছিলেন, ‘ইসরায়েলের বিশাল নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, তবে তারা নির্দিষ্ট কিছু উপাদানের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করে। সেটি মহাকাশ প্রযুক্তির উচ্চমানের উপাদান হতে পারে কিংবা সামরিক গ্রেডের স্টিলের মতো কাঁচামাল হতে পারে।’
একইভাবে ইসরায়েল ট্যাক্স অথোরিটির (আইটিএ) আমদানি-সংক্রান্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আল জাজিরার এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে ইসরায়েলে সামরিক-সংক্রান্ত পণ্য রপ্তানিতে ভারত ছিল দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা উল্লেখ করেছে, এ তথ্যগুলো ইসরায়েলে পাঠানো মোট অস্ত্র স্থানান্তরের একটি আংশিক চিত্র মাত্র এবং গাজায় এসবের চূড়ান্ত ব্যবহার নিশ্চিত করে না। একইভাবে অ্যামনেস্টির গবেষকেরাও আন্তর্জাতিক কাস্টমস ক্লাসিফিকেশন সিস্টেমের সুনির্দিষ্ট ‘হারমোনাইজড সিস্টেম’ (এইচএস) কোডের অধীনে থাকা চালানগুলোর ওপর ভিত্তি করে তাদের বিশ্লেষণ চালিয়েছেন।
এর মধ্যে এইচএস কোড ৯৩০১ থেকে ৯৩০৭ (যা অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং এদের যন্ত্রাংশ ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম কভার করে) এবং এইচএস কোড ৮৭১০ (যা সাঁজোয়া ও যুদ্ধযান এবং এদের উপাদান কভার করে) অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে যেসব চালানে কেবল অভ্যন্তরীণ পণ্য বা পার্ট নম্বর লেখা ছিল এবং জিনিসগুলো সামরিক নাকি বেসামরিক তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি, সেগুলো গবেষকরা বাদ দিয়েছেন। এ ছাড়া দ্বিমুখী ব্যবহারের ছোট অস্ত্রের শত শত চালান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য সম্ভাব্য অস্ত্র, যন্ত্রাংশ ও গোলাবারুদও এই হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, এমন সতর্ক পদ্ধতির কারণে তাদের এই হিসাবটি ভারতের প্রকৃত সামরিক সহায়তার চেয়ে কম হতে পারে। তবুও এ তথ্য প্রমাণ করে যে ইসরায়েলে সামরিক সহায়তা সরবরাহে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানসহ ভারতের একাধিক কোম্পানি সরাসরি জড়িত ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, সংস্থাটি ভারতের ৯টি কোম্পানি এবং ভারত সরকারের কাছে চিঠি পাঠালেও প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো জবাব পায়নি।
অ্যামনেস্টির মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) যেখানে গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যার স্পষ্ট ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দিয়েছে, সেখানে ভারতের কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই না জানার ভান করতে পারে না। ইসরায়েলে অস্ত্র স্থানান্তর অনুমোদন ও সুবিধা দেওয়া যে আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনে সহায়তার সমান, তা তাদের জানা উচিত।’
ক্যালামার্ড আরও যোগ করেন, একদিকে ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় মৃত্যু ও দুর্ভোগ সৃষ্টি করে চলেছে, অন্যদিকে ভারতীয় কোম্পানিগুলো ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা খাতে উপাদান ও গোলাবারুদ সরবরাহ করে মুনাফা কামিয়ে যাচ্ছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে গত এক দশকে দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত গতিতে এগিয়েছে। ভারত বর্তমানে ইসরায়েলি অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। ভারতের একাধিক কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি ইসরায়েলি অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ভারতে নিজস্ব উৎপাদন কারখানা গড়ে তুলেছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে মোদির ইসরায়েল সফরের সময় দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে ‘শান্তি, উদ্ভাবন ও সমৃদ্ধির জন্য বিশেষ কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত করে। এর পর থেকে নতুন নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের আলোচনার মাধ্যমে এই সম্পর্ক আরও সম্প্রসারিত হয়েছে। এমনকি ইসরায়েলের জন্য ভারতে ‘আয়রন ডোম’ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির বিষয়েও আলোচনা চলছে।
কূটনৈতিকভাবে ভারত সরকার ইসরায়েলের অন্যতম দৃঢ় সমর্থক হিসেবে অবস্থান নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দক্ষিণ আফ্রিকার তোলা গণহত্যা-সংক্রান্ত মামলায় নয়া দিল্লি যোগ দিতে অস্বীকার করেছে এবং ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছে।
একই সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরে ফিলিস্তিনপন্থী প্রতিবাদ ও সক্রিয়তার ওপর কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অস্ত্র রপ্তানি বন্ধের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করলে আদালত মামলাটি খারিজ করে দেয়। আদালত জানায়, পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ সরকারের কাজ, বিচার বিভাগের নয়।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্করও বারবার বলেছেন, ভারতের অস্ত্র রপ্তানি পরিচালিত হয় দেশের ‘জাতীয় স্বার্থ’ দ্বারা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জয়শঙ্কর বলেছিলেন, ‘ভারতের যেকোনো রপ্তানি, যার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক প্রভাব রয়েছে, তা আমাদের জাতীয় স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি মেনে পরিচালিত হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইসরায়েলের বিষয়ে বলতে গেলে, জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে আমাদের চমৎকার সহযোগিতার ইতিহাস রয়েছে। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা যখনই হুমকির মুখে পড়েছে, ইসরায়েল বিভিন্ন সময়ে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।’
অ্যামনেস্টির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পড়ুন এখানে