দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর ধীরগতির কারণে বিগত এক শতাব্দীর বেশি সময়ের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ শুষ্ক মাসের সাক্ষী হলো ভারত। চলতি বছরের জুন মাসটি দেশটির আবহাওয়ার ইতিহাসে ১৯০১ সালের পর পঞ্চম সর্বনিম্ন বৃষ্টিপাতের মাস হিসেবে রেকর্ড গড়েছে। মাসজুড়ে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির দেখা না মেলায় ভারতের একটি বিশাল অংশ এখন তীব্র পানিসংকট ও খরা পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
আজ মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর (আইএমডি) এসব তথ্য প্রকাশ করেছে। আবহাওয়াবিদেরা জানিয়েছেন, ১ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত পুরো মাসে দেশটিতে সামগ্রিকভাবে মাত্র ৯৯ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে এই বৃষ্টির পরিমাণ থাকার কথা ছিল অন্তত ১৬৫ দশমিক ৩ মিলিমিটার। সেই হিসাবে পুরো জুন মাসে দেশটিতে গড় বৃষ্টিপাতের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৪০ শতাংশে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে আইএমডির তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, গত ১২৬ বছরের ইতিহাসে কেবল চারটি বছরে এরচেয়ে কম বৃষ্টি হয়েছিল। বছরগুলো হলো—২০০৯ (৮৭.৬ মিমি), ১৯০৫ (৯১.৯ মিমি), ২০১৪ (৯২.৮ মিমি) ও ১৯২৬ (৯৬.৭ মিমি)। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, ভারতে এবারের মৌসুমি বায়ু কতটা বিলম্বিত ও এর প্রভাব কতটা ভয়াবহ।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে ভারতের কৃষি খাতে ইতিমধ্যে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। মাটিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা না থাকায় দেশটির বেশ কয়েকটি কৃষিপ্রধান রাজ্যে চলতি মৌসুমের ফসল বোনার কাজ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি জুন মাসের সিংহভাগ সময়জুড়ে উত্তর ও মধ্য ভারতে তীব্র তাপপ্রবাহ বা হিটওয়েভ পরিস্থিতি ছিল।
আবহাওয়া দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মধ্য ভারত। এই অঞ্চলে স্বাভাবিক ১৭০ দশমিক ৩ মিলিমিটারের বিপরীতে বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৮৪ দশমিক ৪ মিলিমিটার। অর্থাৎ, ঘাটতির পরিমাণ একলাফে ৫০ শতাংশে ঠেকেছে। এ ছাড়া উত্তর-পশ্চিম ভারতে ৩১ শতাংশ ও দক্ষিণ উপদ্বীপে স্বাভাবিকের চেয়ে ২৭ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
রাজ্যভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে এই অনাবৃষ্টির চিত্র আরও ভয়াবহ দেখায়। ভারতের গুজরাট রাজ্যে জুন মাসে সর্বোচ্চ ৮২ শতাংশ বৃষ্টির ঘাটতি দেখা গেছে। এ ছাড়া ছত্তিশগড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে ৬৫ শতাংশ, ঝাড়খন্ডে ৫৯ শতাংশ ও উত্তর প্রদেশে ৫০ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। দিল্লির আকাশেও মেঘের দেখা মেলেনি, সেখানে ঘাটতি ছিল ৪৯ শতাংশ। বিহার, পাঞ্জাব ও মহারাষ্ট্রে ৪৭ শতাংশ করে এবং দক্ষিণ ও উপকূলীয় রাজ্য কেরালায় স্বাভাবিকের চেয়ে ৩৪ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে জুনের এই চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতির পর মাসের একেবারে শেষ দিনে এসে কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আইএমডি জানিয়েছে, আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু আবার নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করতে শুরু করেছে।
আজকের সর্বশেষ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, মৌসুমি বায়ু ইতিমধ্যেই মধ্য প্রদেশের আরও কিছু অংশ, ছত্তিশগড়, ঝাড়খন্ড ও বিহারের অবশিষ্টাংশসহ উত্তর প্রদেশের কিছু এলাকা, উত্তরাখন্ডের বেশির ভাগ অংশ এবং হিমাচল প্রদেশ ও লাদাখের কিছু অংশে সফলভাবে প্রবেশ করেছে। আবহাওয়াবিদেরা আশা করছেন, আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এই পরিস্থিতি আরও অনুকূল হবে এবং বৃষ্টিবাহী মেঘমালা গুজরাট, মধ্য প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, দমন ও দিউ অঞ্চল, জম্মু-কাশ্মীর, হরিয়ানা, চণ্ডীগড়, দিল্লি ও পাঞ্জাবের সিংহভাগ এলাকা এবং রাজস্থানের কিছু অংশে অগ্রসর হতে পারবে।
জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে বঙ্গোপসাগরে একটি নতুন লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়া এবং মৌসুমি অক্ষটি দক্ষিণ দিকে সরে আসার কারণে ভারতের মধ্য, পশ্চিম ও উত্তর অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এটি শতাব্দীর অন্যতম শুষ্কতম মাস জুনের এই ঘাটতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে দিতে পারবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।