ভারতের রাজস্থানের বহু পুরোনো এক সামাজিক প্রথা ‘আতা-সাতা’ বা ‘দেওয়া-নেওয়া’ বিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছে আদালতের এক রায়কে ঘিরে। রাজস্থান হাইকোর্ট এই প্রথাকে ‘আইনি ও নৈতিকভাবে দেউলিয়া’ এবং ‘মানুষের জীবন নিয়ে এক অমানবিক বিনিময়ব্যবস্থা’ বলে মন্তব্য করেছেন। বিকানেরের এক নারীর বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন এই প্রাচীন প্রথাটির কথা সামনে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে আদালত ওই নারীর আবেদন মঞ্জুর করে নিম্ন আদালতের আদেশ বাতিল করেছেন।
রাজস্থানের গ্রামীণ এলাকায় বহু বছর ধরে প্রচলিত ‘আতা-সাতা’ বা ‘দেওয়া-নেওয়া’ বিয়ে এমন এক প্রথা, যেখানে দুটি পরিবার নিজেদের মধ্যে মেয়ে বিনিময় করে বিয়ে দেয়। অর্থাৎ এক পরিবারের ছেলে অন্য পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করলে, পাল্টা হিসেবে অন্য পরিবারের ছেলে ওই পরিবারের আরেক মেয়েকে বিয়ে করে।
অনেক ক্ষেত্রে এই প্রথায় অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাদেরও বিয়ে দেওয়া হয়। আদালতের ভাষায়, এতে মেয়েরা ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং ‘বৈবাহিক বিনিময়ের উপাদান’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৩১ মার্চ হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বিকানেরের এক নারীর বিয়ে হয়। একই দিনে ‘আতা-সাতা’ প্রথা মেনে তাঁর স্বামীর অপ্রাপ্তবয়স্ক বোনের সঙ্গে ওই নারীর ভাইয়ের বিয়েও দেওয়া হয়।
কিন্তু পরে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সেই তরুণী বাল্যবিয়ে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। এর জেরে দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়।
ওই নারীর অভিযোগ, এই বিরোধের পর তাঁকে যৌতুকের দাবিতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। একপর্যায়ে ২০২০ সালের ১৯ মার্চ তাঁর নাবালিকা কন্যাসন্তানসহ তাঁকে শ্বশুরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।
পরে তিনি স্বামী ও শ্বশুরের বিরুদ্ধে যৌতুকের জন্য নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগে এফআইআর করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়।
অন্যদিকে স্বামীও স্ত্রীর বাবা ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেন। এরপর তাঁদের বিরুদ্ধে শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গের ধারায় আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়।
চলমান বিরোধের মধ্যে ওই নারী বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন নিয়ে বিকানেরের পারিবারিক আদালতে যান। তবে ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পারিবারিক আদালত তাঁর আবেদন খারিজ করে দেন।
নিম্ন আদালত স্বামীর এই যুক্তি গ্রহণ করেন যে স্ত্রী স্বেচ্ছায় শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন এবং স্বামীর বোন বাল্যবিয়ে মেনে না নেওয়ায় চাপ সৃষ্টি করতেই ফৌজদারি মামলাগুলো করা হয়েছে।
এরপর ওই নারী হাইকোর্টে আপিল করেন।
হাইকোর্ট পারিবারিক আদালতের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, নিম্ন আদালত ‘আতা-সাতা’ প্রথা থেকে সৃষ্ট পারিবারিক বিরোধের সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার দাম্পত্য নির্যাতনের বিষয়টি গুলিয়ে ফেলেছেন। আদালতের মতে, এটি একটি ‘গুরুতর ভুল’।
রায়ে হাইকোর্ট বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন, ২০০৬-এর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, পারস্পরিক বিনিময়ের ভিত্তিতে, বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জড়িয়ে বিয়ে দেওয়া হলে তা জোরপূর্বক সামাজিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, এই ধরনের প্রথায় শিশুদের—বিশেষ করে মেয়েদের—‘বিয়ের পণ্যে’ পরিণত করা হয়। এমনকি এক মেয়ের জীবন ও স্বাধীনতা অন্য মেয়ের বাধ্যগত থাকার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আদালত এই পরিস্থিতিকে ‘বৈবাহিক জিম্মিদশা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন।
রায়ে আদালত আরও বলেন, ‘কোনো প্রথাই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।’ শৈশব থেকে সামাজিক চাপ ও মানসিক প্রভাবের মাধ্যমে যে সম্মতি আদায় করা হয়, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সেটিকে ‘স্বাধীন সম্মতি’ হিসেবে গণ্য করা যায় না বলেও মন্তব্য করেন বিচারকেরা।
শুনানির সময় ওই নারীর আইনজীবী আদালতকে জানান, মানসিক শান্তি ও বৈবাহিক সম্পর্কের অবসানের স্বার্থে তাঁর মক্কেল অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সব ধরনের ভরণপোষণের দাবি ছেড়ে দিতে প্রস্তুত।
এই বক্তব্য রেকর্ডে নিয়ে আদালত বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন মঞ্জুর করেন। তবে আদালত স্পষ্ট করে দেন, এই রায়ের কারণে চলমান ফৌজদারি মামলা বা সন্তানের জিম্মাসংক্রান্ত বিষয়ে কোনো প্রভাব পড়বে না। আইন অনুযায়ী সেসব বিষয়ে আলাদা বিচার চলবে।