হোম > বিশ্ব > ভারত

মুসলিম নেতার প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় গুঁড়িয়ে দিতে চায় যোগী সরকার

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক। ছবি: আল জাজিরা

ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের রামপুরে মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০টি ভবনের মধ্যে ৩৮টিই গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রশাসনিক নির্দেশের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাবেক ছাত্ররা। তীব্র গরম উপেক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অবস্থান ধর্মঘট করছেন তাঁরা। আন্দোলনকারীদের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই সংখ্যালঘু এই প্রতিষ্ঠানটিকে নিশানা করেছে উত্তর প্রদেশের যোগী আদিত্যনাথের বিজেপি সরকার।

তবে রামপুর জেলা প্রশাসন অভিযোগ করেছে, ভবনগুলো অবৈধভাবে ও নিয়ন্ত্রক নির্দেশিকা লঙ্ঘন করে নির্মাণ করা হয়েছে। ১৫ জুলাই রামপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) এক নোটিশে ৫ আগস্টের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এসব ‘অবৈধ’ ভবন ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভবন না ভাঙলে প্রশাসন নিজেই বুলডোজার দিয়ে অভিযান চালাবে এবং তার খরচ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে আদায় করা হবে বলে সতর্ক করা হয়।

পরে রাজ্য প্রশাসন এই আদেশের ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জহিরুদ্দিন জানিয়েছেন, স্থগিতাদেশের অর্থ এই নয় যে, ভবন ভাঙার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এর অর্থ হলো আরডিএ-এর দেওয়া ৫ আগস্টের ডেডলাইনের মধ্যে ভবন ভাঙা হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় এখন আদালত থেকে এমন এক রায় চাচ্ছে যাতে এই ধ্বংসের আদেশটি সম্পূর্ণ বাতিল বা খারিজ করা হয়।’

২০০৩ সালে গঠিত মোহাম্মদ আলী জওহর ট্রাস্টের মাধ্যমে তিন বছর পর এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন সমাজবাদী পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা আজম খান। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আজীবন আচার্য। বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের এই আদেশকে ‘প্রতিহিংসার রাজনীতি’ বলে অভিহিত করেছেন সমাজবাদী পার্টির সংসদ সদস্য জাভেদ আলী খান। তিনি বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয়কে নিশানা করার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি প্রতিষ্ঠা করেছেন আজম খান। দ্বিতীয়ত, এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন সমাজবাদী পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মুলায়ম সিং। তৃতীয়ত, এটি উদ্বোধন করেছিলেন রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব এবং চতুর্থত, এটি একটি সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয়।’

অন্যদিকে ভবন ভাঙার এই আদেশকে আইনি প্রক্রিয়ার সংগতিপূর্ণ দাবি করে বিজেপির মুখপাত্র রাকেশ ত্রিপাঠী বলেন, ‘কেউ কি অস্বীকার করতে পারবে যে, আজম খান অবৈধ জমিতে এই বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছেন? সমাজবাদী পার্টি সরকারের সময়ে তিনি নিজের পদ ও ক্ষমতা ব্যবহার করে অবৈধ জমিতে এই বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলেন এবং অবৈধ ভবন নির্মাণ করেন। আমরা কেবল অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আইন অনুসরণ করছি, আর তার মানে হলো এই বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে ফেলা উচিত।’

রামপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও আরডিএ-এর ভাইস চেয়ারম্যান অজয় কুমার দ্বিবেদী জানান, ‘তাদের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং তারা লিখিত জবাবও দিয়েছে। জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মিত ৪০টি ভবনের মধ্যে কেবল ২টি গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। বাকি ৩৮টি ভবনই অবৈধ প্রমাণিত হয়েছে।

তবে এই দাবি সম্পূর্ণ নাকচ করে উপাচার্য জহিরুদ্দিন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়টি যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সিংগনখেড়ায় আরডিএ-এর কোনো এখতিয়ার ছিল না। আমরা সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন নিয়ে কোর্স পরিচালনা করছি, যা সব শর্ত পূরণ করলেই কেবল অনুমোদন দেয়।’ আরডিএ-এর এই পদক্ষেপকে শিক্ষার সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘তারা স্বপ্নদ্রষ্টা আজম খানের বিরুদ্ধে একে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, যিনি সংখ্যালঘু, গরিব ও পিছিয়ে পড়া মানুষের উন্নতির জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছিলেন।’

২৫০ একর জুড়ে বিস্তৃত এই ক্যাম্পাসে বর্তমানে ৩ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন, যার প্রায় অর্ধেকই ছাত্রী এবং এক-তৃতীয়াংশের বেশি হিন্দু ধর্মাবলম্বী।

আইন বিভাগের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী ইকরা বলেন, ‘আমাদের অভিভাবকেরা এখানকার পরিবেশ এবং অন্য যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর সন্তুষ্ট ছিলেন। যদি এই বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে ফেলা হয়, তবে আমাদের মতো মেয়েরা অন্য কোথাও পড়ালেখার দ্বিতীয় কোনো সুযোগ পাবে না। আমাদের অভিভাবকেরা আমাদের অন্য কোথাও পাঠাতে রাজি হবেন না।’

প্যারামেডিকেলের প্রথম বর্ষের হিন্দু ছাত্রী চাঁদনী দিওয়াকর ধর্মনাস্থ বসে বলেন, ‘তারা হয়তো একে মুসলিমদের বিশ্ববিদ্যালয় বলতে পারে এবং হ্যাঁ, আইনগত মর্যাদার দিক থেকে এটি অবশ্যই একটি সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয়, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, এখানে অন্যরা পড়ালেখা করে না। আমি গত এক বছর ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ এবং সংখ্যালঘু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে এক দিনের জন্যও নিজেকে অ-মুসলিম মনে হয়নি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র উসামা তাইয়্যব অন্যান্য সফল আন্দোলনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রশ্ন তোলেন, ‘সিজেপির আন্দোলনের পর যদি একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করা যায়, তবে এত শিক্ষার্থী এখানে আন্দোলন করা সত্ত্বেও কেন উত্তর প্রদেশ সরকারকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করতে বাধ্য করা যাবে না?’

আইনের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী উসমান আলী বলেন, ‘অন্যরা যদি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে ফল পেতে পারে, তবে মুসলিম শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে ফেলা বন্ধ করার মতো ন্যায্য দাবি আমরা কেন অর্জন করতে পারব না? এর জন্য যদি ত্যাগের প্রয়োজন হয়, আমরা তা দিতে প্রস্তুত।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘পুলিশ আমাদের বাড়িতে আসছে এবং আমাদের অভিভাবকদের পরিণতি ভোগ করার হুমকি দিচ্ছে, কিন্তু আমরা পিছিয়ে যাব না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক সাবেক ছাত্র আব্দুল কলিম আনসারি অবাক হয়ে বলেন, ‘এটা বিস্ময়কর যে তারা শিক্ষা সংস্কার নিয়ে কথা বলছে, অথচ একটি সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয় জওহর বিশ্ববিদ্যালয়কে ভেঙে ফেলার নোটিশ দেওয়া হলেও তারা নীরব। এখানকার সমস্ত শিক্ষার্থী ও সাবেক শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এখন ঝুঁকিতে, আর আমরা জানি না এখান থেকে আমরা কোথায় যাব।’

এদিকে, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অপূর্বানন্দ ভাঙচুরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, ‘প্রথমত, তাদের হিন্দু ভোটারদের সামনে প্রভাবশালী মুসলিমদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে একটি প্রদর্শনী বা নাটক তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, এই সরকারের পুরো মেয়াদে সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে একটি ধারাবাহিক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এবং তৃতীয়ত, তারা হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে মেলবন্ধন চায় না, যার একটি বড় কেন্দ্র হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।’

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

আন্দোলনের পর গণগ্রেপ্তার—আবারও রাজপথে নামার হুমকি ককরোচদের

স্ত্রীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা, ভিডিও কলে শ্বশুর-শাশুড়িকে দেখালেন স্বামী

ভারতের জেন–জি আন্দোলনে ফেসিয়াল রিকগনিশন: ৩ হাজার অপরাধীকে শনাক্তের দাবি পুলিশের

আন্দোলনকারীদের ‘নর্দমার প্রজন্ম’ বললেন কঙ্গনা, ভারতজুড়ে সমালোচনার ঝড়

শিক্ষামন্ত্রীর মন্ত্রণালয় পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছিল ককরোচরা

ভারতের দিকে তাক করা চীনের ১১টি স্টেলথ যুদ্ধবিমান, জবাব দিতে দিল্লির লাগবে এক দশক

মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের দেওয়া সরকারি চাকরি বাতিল করল মাদ্রাজ হাইকোর্ট

১৯৪ যাত্রী নিয়ে রাজকোটে ইন্ডিগোর মুম্বাইগামী ফ্লাইটের জরুরি অবতরণ

তোমরা আমার জন্য সবকিছু উৎসর্গ করেছ, কিন্তু আমি ব্যর্থ—সুইসাইড নোটে নিট পরীক্ষার্থী

‘জানি, পোস্ট সরানোর জন্য মাকে ফোন করবেন’, শিক্ষামন্ত্রীর পিএর উদ্দেশে বিজেপি এমপির মেয়ে