একবার নয়, দু-দুবার দেশ ও ভিটেমাটি থেকে বিতাড়িত লেখক তসলিমা নাসরিনের কাছে দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২৫ মিনিটের বিলম্ব হয়তো কিছুই নয়। কারণ, নিজের ‘দ্বিতীয় ঘর’ হিসেবে পরিচিত কলকাতায় ফিরতে শেষ পর্যন্ত যে আশ্বাস ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি তিনি খুঁজছিলেন, তা পেয়েছেন দীর্ঘ ১৯ বছর পর।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় কলকাতার রবীন্দ্র সদনের মঞ্চে এক নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তসলিমা নাসরিনকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সরকারিভাবে না হলেও লেখিকাকে কলকাতায় ফিরিয়ে আনার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই চালিয়ে আসা বেশ কয়েকটি সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে এই সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়।
মঞ্চে মাত্র ছয় মিনিট বক্তব্য দিলেও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন, তসলিমা নাসরিনের নিরাপত্তার সার্বিক দায়িত্ব তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণায় রবীন্দ্র সদনে উপস্থিত দর্শকেরা করতালি দিয়ে স্বাগত জানান এবং লেখিকার জন্য কলকাতায় স্থায়ী আবাসনের দাবি তোলেন।
১৯৯৪ সালের ৮ আগস্ট মৌলবাদীদের প্রাণনাশের হুমকির মুখে জন্মভূমি বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তসলিমা নাসরিন। চলতি বছরের আগস্টেই তাঁর স্বদেশহীন জীবনের ৩২ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। ১৯৬২ সালে জন্মগ্রহণ করা এই লেখিকা চলতি মাসের শেষের দিকে তাঁর ৬৪তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন করবেন। অর্থাৎ, জীবনের অর্ধেক সময় তাঁকে কাটাতে হয়েছে জন্মভূমির বাইরে প্রতিনিয়ত হত্যার হুমকি ও কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে।
বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর তিনি কলকাতাকেই নিজের নতুন বাসস্থান বানিয়েছিলেন। কিন্তু ২০০৭ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার মৌলবাদীদের চাপে তাঁকে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য করায়। এরপর ২০০৯ সালে নিউইয়র্ক যাওয়ার আগে তসলিমা নাসরিন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে দুই পৃষ্ঠার ও তাঁর উত্তরসূরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এক পৃষ্ঠার একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। চিঠিতে দুজনের কাছেই তাঁর অনুরোধ ছিল—যাতে তাঁকে প্রিয় শহর কলকাতায় ফিরতে দেওয়া হয়।
তবে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়—কেউই লেখিকার সেই চিঠির জবাব দেননি। যে আশ্বাস তিনি তাঁদের কাছে পাননি, আজ প্রায় এক দশক পর রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছ থেকে সেই আশ্বাস পেলেন তসলিমা।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দীর্ঘ ও আবেগঘন বক্তব্যে তসলিমা নাসরিন বলেন, ‘এই ১৯টা বছর ধরে আমি বারবার কলকাতাকে জিজ্ঞাসা করেছি—আমার অপরাধ কী ছিল? কেন আমাকে এভাবে চলে যেতে হলো? আজ আমি সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজতে আসিনি। আমি আজ এখানে বলতে এসেছি, আমি ফিরে এসেছি। চোখে আমার জল আছে, বুকে জমে থাকা অনেক কষ্ট আছে, কিন্তু দুই হাতে আমি শুধুই ভালোবাসা নিয়ে এসেছি। এই শহর আমাকে কাঁদিয়েছে, এই শহর আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে; কিন্তু এই এতগুলো বছর ধরে আমি শুধু একদিন এই শহরে ফিরে আসার স্বপ্নই বুনে গেছি। আমার চলে যাওয়া আর ফিরে আসার মাঝে ১৯টি বছর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আজ এই শহরের দরজা উন্মুক্ত হওয়া প্রমাণ করে—অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু কখনো স্থায়ী হতে পারে না।’
এদিকে অনুষ্ঠান চলাকালে হঠাৎ একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তসলিমা নাসরিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে দর্শকের সারিতে থাকা প্রখ্যাত কবি জয় গোস্বামীকে মঞ্চে এসে কিছু বলার জন্য আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু লেখিকার এই আহ্বানে উপস্থিত দর্শকদের একটি বড় অংশ প্রতিবাদ ও হট্টগোল শুরু করে। মমতার ১৫ বছরের শাসনামলে কবি জয় গোস্বামী শাসকঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
দর্শকদের এই ক্ষোভ তাঁর অতীতের সেই পরিচয়ের কারণে নাকি সন্ধ্যা গড়িয়ে যাওয়ার কারণে—তা স্পষ্ট না হলেও ওই সময় অনুষ্ঠানস্থলে সাময়িক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। বাধ্য হয়ে কবি জয় গোস্বামী মঞ্চের সিঁড়ি দিয়ে উঠেও বক্তব্য না দিয়ে নিচে নেমে যান।
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত, নগর উন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পল, তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী কল্যাণ চক্রবর্তী ও সাবেক রাজ্য বিজেপি সভাপতি তথাগত রায়। অনুষ্ঠানে মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পল স্বরচিত কবিতা পাঠ করে শোনান। অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত স্মৃতিচারণ করে জানান, একসময় দিল্লিতে তসলিমার প্রতিবেশী থাকাকালে তাঁর রাজনৈতিক মতবিরোধী মণি শংকর আইয়ারও একমত হয়েছিলেন যে, তসলিমা নাসরিনের ভিসা পাওয়া উচিত।