হোম > বিশ্ব > ভারত

রুশ শ্যাডো ফ্লিট: যুক্তরাজ্যে ১০ বছর কারাদণ্ডের মুখে ভারতীয় ক্যাপ্টেন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

৩৮ বছর বয়সী অজয় পান্থ বর্তমানে যুক্তরাজ্যের হেফাজতে রয়েছেন। ছবি: এএফপি

গত জুনে ব্রিটিশ কমান্ডোদের হাতে গ্রেপ্তার হন রাশিয়ার ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া নৌবহরের একটি তেলবাহী জাহাজের ভারতীয় ক্যাপ্টেন অজয় পান্থ। ৩৮ বছর বয়সী অজয় পান্থ বর্তমানে যুক্তরাজ্যের হেফাজতে রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে বলে এনডিটিভির প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে। মামলাটি বাণিজ্যিক জাহাজের নাবিকদের ক্ষেত্রে একটি আইনি নজির তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

এদিকে তাঁর স্ত্রী দাবি করেছেন, অজয় পান্থকে এ ঘটনায় ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হয়েছে। এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ৩৬ বছর বয়সী ঋতু পান্থ বলেন, ‘আমার স্বামীকে শুধু বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। তিনি ভুল সময়ে ভুল জায়গায় ছিলেন।’

গত ১৪ জুন ইংলিশ চ্যানেলে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেলবাহী ট্যাংকার স্মিরতোসে একটি হেলিকপ্টার থেকে দড়ি বেয়ে নেমে এটিকে আটক করেন ব্রিটিশ কমান্ডোরা। জাহাজটির ক্যাপ্টেন ছিলেন অজয় পান্থ।

অভিযোগ রয়েছে, স্মিরতোস রাশিয়ার ‘শ্যাডো ফ্লিটের’ অংশ। অস্পষ্ট মালিকানা ও বীমাব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত জাহাজের এই নেটওয়ার্ক ২০২২ সালে ইউক্রেনে হামলার পর রাশিয়ার ওপর আরোপ করা তেল নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে মস্কো ব্যবহার করে।

মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, স্মিরতোস গত ৫ জুন রাশিয়ার উস্ত-লুগা বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে। বাল্টিক সাগর পেরিয়ে জাহাজটির গন্তব্য হিসেবে মিসরের পোর্ট সাঈদের নাম উল্লেখ ছিল। কিন্তু ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রমের সময় জাহাজটির ওপর অভিযান চালান ব্রিটিশ কমান্ডোরা।

যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে এ ধরনের অভিযান এটাই প্রথম। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এ অভিযানকে রাশিয়ার জন্য একটি ‘ধাক্কা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

পান্থের স্ত্রী বলেন, তাঁর স্বামী এ ঘটনার শিকার। জামিন না পাওয়ায় হেফাজতে থেকে তিনি কঠিন সময় পার করছেন। গ্রেপ্তারের পর তাঁদের প্রথম ফোনালাপের কথা স্মরণ করে চোখের পানি সামলানোর চেষ্টা করতে করতে ঋতু পান্থ বলেন, ‘তিনি ভেঙে পড়েছিলেন এবং শুধু কাঁদছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছে, তিনি তা বুঝতে পারেননি...তিনি শুধু বলেছিলেন, “আমি কারাগারে আছি, দয়া করে আমাকে এখান থেকে বের করে নাও।”’

এদিকে প্রসিকিউশন দাবি করছে, অজয় পান্থ ছিলেন জাহাজটির ‘মাস্টার’ বা ক্যাপ্টেন এবং প্রায় ৯৮ হাজার টন তেলের চালান সম্পর্কে তাঁর জানা ছিল। তবে আদালতের এক শুনানিতে পান্থের আইনজীবী বলেন, জাহাজের কর্মী হিসেবে তিনি ‘শুধু নির্দেশ পালন করছিলেন’।

তাঁর স্ত্রীও একই যুক্তি তুলে ধরেছেন। ঋতু পান্থ বলেন, ‘যেকোনো জাহাজে ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব হলো পণ্য নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া।’

ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব ইন্টারন্যাশনাল ল–এর আনোয়ার সাদাত বলেন, এ মামলায় ‘জটিল’ আইনি প্রশ্ন উঠেছে।

আগামী ১৫ ডিসেম্বর পান্থের বিচার শুরু হওয়ার কথা। রাশিয়ার শ্যাডো ফ্লিটের বিরুদ্ধে ইউরোপের দেশগুলো যখন পদক্ষেপ জোরদার করছে, তখন মামলাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

ধারণা করা হচ্ছে, ইউরোপের কোনো দেশ প্রথমবারের মতো জাহাজ বা এর মালিকদের পরিবর্তে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে কোনো জাহাজের ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাট সি ইন্টারন্যাশনালের ডেভিড হ্যামন্ড লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের জন্য লেখা এক বিশ্লেষণে বলেন, ‘এই মামলার প্রভাব একটি জাহাজ, এর পণ্য বা এর ক্যাপ্টেনের ভাগ্যের চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত।’

তিনি বলেন, ‘শ্যাডো ফ্লিটের পরিচালকদের পাশাপাশি এসব জাহাজে কর্মরত নাবিকদের বিরুদ্ধেও ফৌজদারি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে পশ্চিমা সরকারগুলো কতটা এগোতে প্রস্তুত, এ মামলা তার প্রাথমিক পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।’

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কনস্যুলার কর্মকর্তারা পান্থের ‘খোঁজখবর নিতে’ তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন।

পান্থ ছিলেন জাহাজে থাকা একমাত্র নাবিক, যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। জাহাজটির বাকি ২৪ ক্রু সদস্যের বেশির ভাগকে এরই মধ্যে নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। জাহাজটি এখনো ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলের কাছে নোঙর করা রয়েছে।

প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মধ্যে টানাপোড়েনে ‘মাঝখানে আটকে পড়ার’ আশঙ্কায় নাবিকেরা ভীত হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের নাবিকবিষয়ক বিভাগের সমন্বয়ক স্টিভ ইয়ান্ডেল। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় নাবিকেরা জানতেই পারেন না, তাঁদের জাহাজে নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত তেল বহন করা হচ্ছে কি না। আর এর ফলে তাঁরা সম্ভাব্যভাবে ভূরাজনৈতিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।’

৩ লাখ ২০ হাজারের বেশি নাবিক নিয়ে ভারত বৈশ্বিক বাণিজ্যিক নৌপরিবহন খাতের কর্মীবাহিনীর একটি বড় অংশ।

৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ ভারতীয় ট্যাংকার ক্যাপ্টেন সংকেত জোশি বলেন, ঘটনাটি খুবই উদ্বেগজনক। নিরাপত্তাসংক্রান্ত কোনো ইস্যুর পরিবর্তে ‘বাণিজ্যিক দিক’ বিবেচনায় কোনো জাহাজের ক্যাপ্টেনকে গ্রেপ্তারের ঘটনা সম্ভবত এটাই প্রথম।

গ্রেপ্তারের কয়েক দিন আগে পান্থ তাঁর স্ত্রীকে চিঠি লিখেছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালির আশপাশে সমুদ্রে কয়েকজন ভারতীয় নাবিক নিহত হওয়ার আরেকটি সংঘাতের প্রভাব নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

ঋতু পান্থ বলেন, ‘তিনি বলেছিলেন, এখন সমুদ্র খুব কঠিন জায়গা হয়ে উঠছে। আমি শুধু প্রার্থনা করছিলাম এবং তাঁকে বলছিলাম, “শান্ত থেকো, সতর্ক থেকো এবং আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখো।”’

পান্থের মা দীপা কাঁদতে কাঁদতে তাঁর ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনার আবেদন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু দুই হাত জোড় করে সরকারের কাছে আবেদন করতে চাই, আমার ছেলেকে বাড়িতে ফিরিয়ে দিন।’