বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার পর অযোধ্যায় একটি বিকল্প মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। তবে কোর্টের রায়ের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত বিকল্প মসজিদ নির্মাণের প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছে কর্তৃপক্ষ। বার্তা রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মুসলিম সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে অনুদানে আশানুরূপ সাড়া না মেলায় বিশাল প্রকল্পটিকে মূল পরিকল্পনার তুলনায় ছোট করা হচ্ছে।
আজ বুধবার মসজিদ নির্মাণ কমিটির শীর্ষ কর্মকর্তারা এই তথ্য জানিয়েছেন।
ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা বহু দশক ধরেই দেশটির অন্যতম প্রধান এবং সংবেদনশীল ধর্মীয় বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। বিশেষ করে ১৯৯২ সালে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা ১৬ শতকের ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেললে শহরটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোচনায় আসে। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ দাঙ্গায় প্রায় ২ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন, যাদের বেশির ভাগই ছিলেন মুসলিম।
পরবর্তীতে ২০১৯ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট হিন্দুদের পক্ষে রায় দেন এবং একই সঙ্গে বিকল্প হিসেবে আরেকটি মসজিদ নির্মাণের জন্য মুসলিম সম্প্রদায়কে অযোধ্যার ধন্নীপুর এলাকায় পাঁচ একর জমি বরাদ্দ দিতে রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেন। এই মসজিদ ও তৎসংলগ্ন জনকল্যাণমূলক স্থাপনাগুলো নির্মাণের জন্য ‘ইন্দো-ইসলামিক কালচারাল ফাউন্ডেশন’ (আইআইসিএফ) গঠিত হলেও তহবিল সংকটের কারণে পাঁচ একরের ওই প্লটের মূল মহাপরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ট্রাস্টের কর্মকর্তারা।
আইআইসিএফ-এর চেয়ারম্যান জুফার আহমদ ফারুকী সরাসরি তহবিলের অভাবকে দায়ী করে বলেন, ‘এই প্রকল্পটির প্রতি সাধারণ মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে এক ধরনের অনীহা ও উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে। এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ অনুদান জমা পড়েছে, তা দিয়ে মূল নকশা বাস্তবায়ন অসম্ভব। তাই আমরা এখন প্রাথমিকভাবে প্রস্তাবিত মসজিদের চেয়ে ছোট আকারের একটি মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করছি।’
আইআইসিএফ-এর মূল পরিকল্পনায় ওই পাঁচ একর জমিতে একটি আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদের পাশাপাশি একটি ৩০০ শয্যার মাল্টি-স্পেশালিটি হাসপাতাল, একটি উন্নত গবেষণাগার এবং একটি বিশাল পাঠাগার নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অনুদান না আসায় পুরো প্রকল্পটিই এখন ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম। আইআইসিএফ-এর সম্পাদক আতাহার হুসাইন জানিয়েছেন, তাঁরা এখন একটি ‘ছোট মসজিদ’ নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন, যার জন্য আনুমানিক ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন (৩ থেকে ৫ কোটি) ভারতীয় রুপি প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, এ পর্যন্ত তাঁরা অনুদান হিসেবে মাত্র ১৫ মিলিয়ন বা দেড় কোটি রুপি সংগ্রহ করতে পেরেছেন।
অন্যদিকে, মুসলিমদের এই মসজিদ প্রকল্পটি যখন তহবিল সংকটে পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে, তখন ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তাদের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করে বিতর্কিত ওই স্থানেই একটি বিশাল ও জমকালো রামমন্দিরের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছে। ২০২৪ সালে নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই মন্দিরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন।
তবে নবনির্মিত এই রামমন্দির নিয়েও বর্তমানে ভারতে নানা বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মন্দির তহবিলে আসা সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকার অনুদান চুরির অভিযোগ ওঠার পর গতকাল মঙ্গলবার রামমন্দির ট্রাস্টের শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের রদবদল আনতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে রামমন্দিরের এই চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকারি দলের সমালোচনায় মেতেছে বিরোধী দলগুলো। এর মধ্যে আগামী বছরের শুরুতে ভারতের সবচেয়ে জনবহুল এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে রামমন্দিরের এই কেলেঙ্কারি ক্ষমতাসীন বিজেপির জন্য যেমন বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা, তেমনি তা নির্বাচনী বৈতরণি পার হওয়ার ক্ষেত্রে বিরোধীদের জন্য এক বড় হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।