বাংলাদেশের সঙ্গে ঐতিহাসিক ফারাক্কা পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন না করার আহ্বান জানিয়েছেন ভারতীয় রাজ্যসভার সংসদ সদস্য সাংসদ (এমপি) সঞ্জয় কুমার ঝা। বিহারের রাজনৈতিক দল জনতা দলের (ইউনাইটেড) ওয়ার্কিং ন্যাশনাল কমিটির প্রেসিডেন্ট সঞ্জয় কুমার ঝা বিহারের দীর্ঘমেয়াদি জলনিরাপত্তার আলোকে বিষয়টি উত্থাপন করেন। ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইয়ের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি উল্লেখ করেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ফারাক্কা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর শেষ হতে চলেছে। তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে এই চুক্তি নবায়ন না করার জন্য জোরালোভাবে আহ্বান জানান। এর পরিবর্তে গঙ্গা অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল বিহারসহ সব রাজ্যের ২০৫০ সাল পর্যন্ত পানির চাহিদার সুনির্দিষ্ট ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে একটি নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি।
ভারতীয় পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় সঞ্জয় কুমার ঝা বলেন, তাঁর দল জনতা দল (ইউনাইটেড) এবং দলের জাতীয় সভাপতি ও বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার শুরু থেকেই ফারাক্কা পানি চুক্তির বিরোধিতা করে আসছেন। তিনি বলেন, ‘জেডিইউ মনে করে, এই চুক্তিতে বিহারের বৃহত্তর স্বার্থ উপেক্ষা করা হয়েছে।’
বিহার সরকারের জলসম্পদমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ও তিনি বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কেন্দ্রীয় সরকারকে ফারাক্কা পানি চুক্তিটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছিলেন। এর আগে রাজ্যসভায় ‘স্পেশাল মেনশন’-এর মাধ্যমে নিজের বক্তব্য তুলে ধরে সঞ্জয় কুমার ঝা বলেন, ‘কলকাতা বন্দর এবং হুগলি নদীতে পর্যাপ্ত পানির প্রবাহ বজায় রাখার জন্য মূলত ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘তবে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর তৎকালীন ইউপিএ (কংগ্রেসের নেতৃত্বে জোট সরকার) সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে যে ফারাক্কা পানি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, সেটি বিহারের পানি নিরাপত্তার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। গত তিন দশকের অভিজ্ঞতা দেখায়, শুষ্ক মৌসুমে বিহার তীব্র পানিসংকটের মুখোমুখি হয়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং দক্ষিণ বিহারে সুপেয় পানির সংকট ক্রমেই গুরুতর হয়ে উঠছে।’
সঞ্জয় কুমার ঝা বলেন, বিহারের গঙ্গা অববাহিকা-সংলগ্ন এলাকাগুলোর কৃষি, পানীয় জল, শিল্পোন্নয়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত গঙ্গার পানি পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে পানিসংকটের কারণে বিশেষ করে দক্ষিণ বিহারের জেলাগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। এর ফলে সেচব্যবস্থা এবং পানীয় জল সরবরাহ উভয় ক্ষেত্রেই গুরুতর সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
রাজ্যসভায় বিহার সরকারের দেওয়া পূর্বাভাসের কথা উল্লেখ করে সঞ্জয় কুমার ঝা জানান, ২০৫০ সালের মধ্যে ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটাতে বিহারের প্রায় দুই হাজার কিউসেক অতিরিক্ত পানি প্রয়োজন হবে। কিন্তু বর্তমান ফারাক্কা পানি চুক্তিতে এই প্রয়োজনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম পানির ব্যবস্থা রয়েছে। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারকে গঙ্গা অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল বিহারসহ সব রাজ্যের প্রকৃত পানির চাহিদা নিয়ে নতুন করে একটি বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন করার আহ্বান জানান। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে একটি নতুন কাঠামো বা ব্যবস্থা প্রণয়নেরও দাবি জানান তিনি।
সঞ্জয় কুমার ঝা কেন্দ্রীয় সরকারকে সতর্ক করে বলেন, বিহারের কৃষি, পানীয় জল এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য পর্যাপ্ত পানির নিশ্চয়তা না দিয়ে যদি ফারাক্কা পানি চুক্তি নবায়ন করা হয়, তাহলে এর ‘বিরূপ প্রভাব পড়বে রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পাশাপাশি লাখো মানুষের জীবিকার ওপরও।’