ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের অরক্ষিত অংশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য প্রায় ১ হাজার ২৪ দশমিক ৭৫ একর জমি আনুষ্ঠানিকভাবে সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে তুলে দিয়েছে শুভেন্দু অধিকারী সরকার। ক্ষমতায় আসার প্রথম ৬৫ দিনের মধ্যেই বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে রাজ্য সরকার।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, গত মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই জমি হস্তান্তরের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেন এবং অনুপ্রবেশ রোধে সীমান্তকে আরও শক্তিশালী ও সুরক্ষিত করার ব্যাপারে তাঁর সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেন্দু লেখেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আমাদের সীমান্তকে আরও শক্তিশালী করা আমাদের সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সুরক্ষিত করার অঙ্গীকার অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য বিএসএফের কাছে জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া আমরা দ্রুততর করেছি।’
তিনি আরও লেখেন, ‘আজ পর্যন্ত মোট ১৭২ দশমিক ৬ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে ১ হাজার ২৪ দশমিক ৭৫ একর জমি আনুষ্ঠানিকভাবে এই উদ্দেশ্যে হস্তান্তর করা হয়েছে।’
গত ১৮ জুন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় রাজ্যপাল আরএন রবি অনুপ্রবেশ রোধে রাজ্য সরকারের দ্রুত পদক্ষেপের প্রশংসা করেন এবং মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী শপথ নেওয়ার মাত্র ১০ দিনের মধ্যেই বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা জমির পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। বিধানসভায় রাজ্যপাল বলেন, ‘সীমান্ত অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং অনুপ্রবেশ রোধের লক্ষ্যে, আমার সরকার ২০ মে ২০২৬ তারিখে ভেস্টিং এবং সরাসরি ক্রয়ের মাধ্যমে ৮৫ দশমিক ৭৬ একর জমি বিএসএফের হাতে তুলে দিয়েছে। এছাড়া আরও ৮৮ দশমিক ৪০১ একর জমি সরাসরি ক্রয় ও অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান।’ তিনি আরও জানান, এই কৌশলগত প্রকল্পের জন্য তখনও আরও ৮৯৭.৪৭৭ একর জমি বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা বাকি ছিল।
শুভেন্দুর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট নয়টি জেলার জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে দীর্ঘ সীমান্ত অংশের জন্য জমি হস্তান্তর করা হয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলায়। সেখানে ৪৫.৪ কিলোমিটার সীমান্তে বেড়া নির্মাণের জন্য বিএসএফকে ৩৩৭ একর জমি দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, সবচেয়ে কম জমি হস্তান্তর করা হয়েছে জলপাইগুড়ি জেলায়। সেখানে এখন পর্যন্ত মাত্র দশমিক ৩১ কিলোমিটার সীমান্তে বেড়া নির্মাণের জন্য ২ দশমিক ১৭ একর জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সীমান্তে বেড়া নির্মাণ সম্পূর্ণ করতে বিএসএফের যে পরিমাণ জমির প্রয়োজন ছিল, তার অধিকাংশই ইতোমধ্যে আধাসামরিক বাহিনীর হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বারবার অভিযোগ করেছিলেন যে, পূর্ববর্তী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার ভোটব্যাঙ্ক রক্ষার উদ্দেশ্যে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য বিএসএফকে জমি দেয়নি। তাঁর অভিযোগ ছিল, এর ফলে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ রোধে কেন্দ্রের প্রচেষ্টায় বাধা সৃষ্টি হয়েছে। অমিত শাহ রাজ্যের মানুষকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, বিজেপি সরকার গঠন করতে পারলে বেড়া নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ৬০০ একর জমি ৪৫ দিনের মধ্যেই বিএসএফকে হস্তান্তর করা হবে, যাতে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ করা যায়।
এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন ৬৫ দিনের মধ্যেই ১ হাজার একরেরও বেশি জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।’
শুভেন্দু অধিকারী আন্তর্জাতিক সীমান্তজুড়ে বেড়া নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ করতে বিএসএফকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘আমরা এই প্রকল্পগুলি সম্পূর্ণ করতে এবং আমাদের নাগরিকদের জন্য আরও নিরাপদ ও সুরক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমাদের অঙ্গীকারে অটল রয়েছি।’
মঙ্গলবার শুভেন্দু অধিকারী পূর্ববর্তী তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে ‘একচোখা সরকার’ বলে আখ্যা দেন এবং অভিযোগ করেন, তারা তোষণের নীতি অনুসরণ করত। হুগলি জেলার তারকেশ্বরে বিখ্যাত শ্রাবণী মেলার উদ্বোধন করতে গিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন। বাংলা মাস শ্রাবণে হাজার হাজার পুণ্যার্থী তারকেশ্বরের প্রসিদ্ধ শিবমন্দিরে পূজা দিতে এই মেলায় অংশ নেন। এ বছর অল্প সময়ের মধ্যেই মেলার প্রচার এবং নির্বিঘ্ন আয়োজন নিশ্চিত করতে সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে এবং সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা প্রদান করেছে।
শুভেন্দু বলেন, ‘পূর্ববর্তী সরকারের সময় তারকেশ্বর ধাম অবহেলিত ছিল। মানুষের জন্য কাজ করতে হলে যে কোনও সরকারেরই দুই চোখ খোলা রাখা উচিত, একচোখা হওয়া উচিত নয়।’ একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী সরকার একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে তুষ্ট করার নীতি অনুসরণ করেছিল। মুখ্যমন্ত্রী আরও ঘোষণা করেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে শ্রাবণ মাসের প্রতি সোমবার হেলিকপ্টার থেকে পুণ্যার্থীদের ওপর ফুলের পাপড়ি বর্ষণ করা হবে। তিনি জানান, তারকেশ্বরকে একটি আন্তর্জাতিক তীর্থস্থানে পরিণত করতে এবং শ্রাবণী মেলাকে জাতীয় মেলার মর্যাদায় উন্নীত করতে সরকার সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।