হোম > বিশ্ব > ভারত

সোনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনী কেন প্রকাশ করতে চাচ্ছে না পেঙ্গুইন, কী আছে বইটিতে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

সোনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনীর প্রচ্ছদ। ছবি: সংগৃহীত

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের শীর্ষ নেত্রী ও সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর বহুপ্রতীক্ষিত আত্মজীবনী ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ’ ভারতে প্রকাশ করা নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক ও জটিলতা তৈরি হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা ‘আলফ্রেড এ নফ’ বইটি প্রকাশের প্রস্তুতি নিলেও, ভারতে এর স্বত্ব ও প্রকাশনা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

পাণ্ডুলিপি পর্যালোচনার সময় চীনের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত বিরোধ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্ব ও সরকারের নীতি এবং জাতীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) ঐতিহাসিক ভূমিকা—এই তিনটি সংবেদনশীল বিষয়ে সোনিয়া গান্ধীর মূল্যায়ন বাদ বা সম্পাদনা করা নিয়ে মূল মতপার্থক্য তৈরি হয়।

আন্তর্জাতিক প্রকাশক ‘আলফ্রেড এ নফ’ ঘোষণা করেছে, আগামী ১০ নভেম্বর বিশ্বজুড়ে আত্মজীবনীটি মুক্তি পাবে এবং ইতিমধ্যে ই-বুক সংস্করণের অগ্রিম বায়না (প্রি-অর্ডার) শুরু হয়েছে।

তবে ভারতে এটি কোন প্রতিষ্ঠান প্রকাশ করবে বা আদৌ কোনো ভারতীয় সংস্করণ আসবে কি না, তা নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

কংগ্রেস দলীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আত্মজীবনীর পাণ্ডুলিপি পর্যালোচনার সময় ‘পেঙ্গুইন র‍্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া’ বইটির কয়েকটি নির্দিষ্ট অধ্যায় ও মন্তব্য নিয়ে আপত্তি প্রকাশ করে। তারা বিষয়গুলো পরিবর্তন বা বাদ দেওয়ার পরামর্শ দেয়। কিন্তু সোনিয়া গান্ধী সেই প্রস্তাবে সম্মত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া ভারতে বইটি প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে।

দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, মূলত তিনটি মূল বিষয়ে সম্পাদনার প্রস্তাব ঘিরে মতপার্থক্য চরমে পৌঁছায়:

ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধ ও অনুপ্রবেশ: বইটিতে ভারত-চীন সীমান্ত পরিস্থিতি এবং ভারতীয় ভূখণ্ডে চীনা সামরিক বাহিনীর অনুপ্রবেশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন সোনিয়া গান্ধী। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীসহ কংগ্রেস নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে পার্লামেন্টে ও জনসমক্ষে এ বিষয়টি নিয়ে মোদী সরকারকে আক্রমণ করে আসছে। বইটিতে এই সংক্রান্ত কংগ্রেসের রাজনৈতিক অবস্থানের পেছনের যুক্তি ও সোনিয়া গান্ধীর নিজস্ব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্ব ও সরকারের নীতি: পাণ্ডুলিপিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রশাসনিক কর্মপদ্ধতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার ধরন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক মূল নীতির তীব্র সমালোচনা রয়েছে। মোদী সরকারের অধীনে ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়েও সোনিয়া গান্ধী তাঁর নিজস্ব মূল্যায়ন ব্যক্ত করেছেন।

আরএসএসের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা: ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজনৈতিক ও আদর্শগত মূল সংগঠন আরএসএসের ইতিহাস এবং ভারতের সামাজিক কাঠামোয় তাদের প্রভাব নিয়ে বইটিতে কঠোর বক্তব্য রয়েছে। নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং রাজনৈতিক অঙ্গনে আসার আগে আরএসএসের পূর্ণকালীন প্রচারক হিসেবে কাজ করেছেন, ফলে এই অংশটিকে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কংগ্রেস সূত্র জানায়, প্রকাশনা সংস্থার পক্ষ থেকে এসব অংশ সংশোধন বা বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও সোনিয়া গান্ধী তা দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর বক্তব্য হলো, আত্মজীবনীতে উঠে আসা প্রতিটি পর্যবেক্ষণ ও তথ্য তাঁর দীর্ঘ ছয় দশকের অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। ফলে নীতিগতভাবেই তিনি পাণ্ডুলিপির কোনো অংশে পরিবর্তন আনতে রাজি নন।

কংগ্রেসের একাংশ অভিযোগ করেছে, এই বিতর্কের পেছনে ক্ষমতাসীন বিজেপির পরোক্ষ রাজনৈতিক চাপ কাজ করেছে, যা মূলত স্বাধীন প্রকাশনা ও বাক্‌স্বাধীনতার ওপর এক ধরনের অদৃশ্য সেন্সরশিপ।

এদিকে প্রকাশনা বিতর্ক নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার মুখে ‘পেঙ্গুইন র‍্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া’ একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করেছে। বিবৃতিতে তারা জানায়, তারা কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে এই বইটির ভারতীয় প্রকাশক হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হয়নি। পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করে, যেকোনো প্রকাশকের জন্য তথ্য যাচাই (ফ্যাক্ট চেক) করা এবং লেখকের বইয়ের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান করা স্বাভাবিক দায়িত্ব ও পেশাগত অধিকারের মধ্যে পড়ে। এটি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত সাধারণ ও নিয়মিত নিয়ম।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আলোচনার প্রতিটি পর্যায়ে পেঙ্গুইন র‍্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া বইটি প্রকাশ করার বিষয়ে অত্যন্ত আগ্রহী ছিল। তবে লেখকের সঙ্গে আমাদের গোপনীয় আলোচনার বিষয়ে এর বাইরে আর কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়।

এদিকে পেঙ্গুইন পিছিয়ে যাওয়ার পর ভারতীয় প্রকাশনা বাজারে বইটি নিয়ে নতুন কৌশলগত প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রকাশনা সংস্থা ‘হার্পারকলিন্স’-সহ ভারতের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনী এখন বইটির ভারতীয় সংস্করণের স্বত্ব পেতে জোরালো আলোচনা চালাচ্ছে।

‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ’— আত্মজীবনীতে কী লিখেছেন সোনিয়া গান্ধী?

‘আলফ্রেড এ নফ’-এর মাধ্যমে প্রচারিত এক বার্তায় সোনিয়া গান্ধী তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, ব্যক্তিগত জীবন ও ভারতের রাজনীতির জটিল সমীকরণ নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন।

বইটির পটভূমি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সোনিয়া গান্ধী লিখেছেন, ‘আমার পরিবারকে নিয়ে এ পর্যন্ত বহু কিছু লেখা হয়েছে, তবে তাঁদের মূল অনুপ্রেরণা, কাজকর্ম কিংবা তাঁদের একেবারে মানবিক ভুলত্রুটিগুলোর কথা খুব কম লেখাতেই বস্তুনিষ্ঠভাবে উঠে এসেছে। বহু দিক থেকেই এই বইটি তাঁদের সেই মানবিকতার প্রতি একটি শ্রদ্ধাঞ্জলি।’

রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশের স্মৃতি ও ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নিজের জীবন নিয়ে লেখা আমার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। এর অর্থ ছিল নিজেকে উন্মুক্ত করা এবং যেসব গোপন অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা এত দিন হৃদয়ের গভীরে লালন করেছি, তা পাঠকের সামনে তুলে ধরা। রাজনীতিতে প্রবেশের পূর্ব পর্যন্ত আমি আমার ব্যক্তিগত জীবনকে অত্যন্ত কঠোরভাবে লোকচক্ষুর অন্তরালে রেখেছিলাম। শেষ পর্যন্ত শোক ও অপূরণীয় ক্ষতিই আমাকে রাজনীতির এই সাধারণ ও উন্মুক্ত জগতে ঠেলে দিয়েছে।’

ইতালি থেকে ভারতে আসার জার্নি এবং নেহরু-গান্ধী পরিবারের সঙ্গে তাঁর বন্ধনের কথা উল্লেখ করে সোনিয়া গান্ধী বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে ধীরে ধীরে সরে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে তাকানোর পরই তাঁর জীবনের মূল সুরটিকে তিনি চিনতে পেরেছেন—যা হলো ভালোবাসা ও আনুগত্যের এক অবিচ্ছেদ্য সুতা।

ইতালির ছোট্ট শহরের সাধারণ শৈশব থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পুত্রবধূ এবং রাজীব গান্ধীর স্ত্রী হিসেবে ভারতের জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে অভিযোজিত হওয়ার অভিজ্ঞতা বইটিতে স্থান পেয়েছে।

রাজীব হত্যা, ১০ জনপথের রাজনীতি ও ২০০৪ সালের প্রধানমন্ত্রী পদ প্রত্যাখ্যান স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে। এতে আরও আছে ভারতীয় ইতিহাসের কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ট্র্যাজিক অধ্যায়। ১৯৮৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং তার সাত বছর পর ১৯৯১ সালে স্বামী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি কীভাবে তাঁর পুরো জীবনকে তছনছ করে দিয়েছিল, তা খোলাখুলিভাবে বর্ণনা করেছেন সোনিয়া।

এ ছাড়া ভারতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস দলের দীর্ঘতম মেয়াদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা, তৎকালীন প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে সরকারের যৌথ পরিচালনার দিনগুলোর কথাও বইটিতে স্থান পেয়েছে বলে জানা গেছে।

বইয়ে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে ২০০৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস জোটের বিজয়ের পর দেশজুড়ে তীব্র জল্পনা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর পদ প্রত্যাখ্যান করার সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। কী প্রেক্ষাপটে এবং কোন মানসিক ভাবনায় তিনি ড. মনমোহন সিংকে প্রধানমন্ত্রী পদে মনোনীত করেছিলেন এবং নিজে নেপথ্যে থেকে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছিলেন—বইটিতে তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতে বইটির প্রকাশনা নিয়ে তৈরি হওয়া এই সংঘাত প্রমাণ করে যে, রাজনীতি থেকে আংশিক অবসর নিলেও ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে সোনিয়া গান্ধীর লেখনী ও মূল্যায়নের প্রভাব কতটা গভীর ও সংবেদনশীল।