শিখ সাম্রাজ্যের শেষ মহারাজা দুলীপ সিংহের জীবন ছিল রাজকীয় ঐতিহ্য, নির্বাসন, পরিচয়ের সংকট এবং মানবিকতার এক অনন্য উপাখ্যান। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে শিখ মহারাজার উপাধি পেলেও ১৮৪৯ সালে ব্রিটিশদের হাতে শিখ সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হওয়ার পর তাঁকে নির্বাসনে পাঠানো হয় ব্রিটেনে। পরবর্তীতে ভারতে ফিরে যাওয়ার একাধিক চেষ্টা করলেও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাঁকে দেশে ফেরার অনুমতি দেয়নি।
শেষ পর্যন্ত ২৫ বছর বয়সে দুলীপ সিংহ ইংল্যান্ডের সাফোকের অ্যালভেডেন হল কিনে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন জার্মান ও আবিসিনীয় বংশোদ্ভূত বাম্বা মুলার। এই দম্পতির ছিল ছয় সন্তান।
রোববার (২৬ জুলাই) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, দুলীপ সিংহের জীবনের গল্পের প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয় এসেক্সের হ্যালস্টেডের বাসিন্দা পিটার ব্যান্সের। কারণ তিনি নিজেও শিখ বংশোদ্ভূত। ১৯৯৬ সালে অ্যালভেডেন হলে গিয়ে ব্যান্স প্রথমবার মহারাজার জীবন সম্পর্কে জানতে শুরু করেন। এরপর প্রায় তিন দশক ধরে তিনি দুলীপ সিং ও তাঁর পরিবারের ইতিহাস, স্মৃতি ও নিদর্শন সংগ্রহ করেছেন। ব্যান্স জানান, কাজটি করতে গিয়ে তাঁর মনে হয়েছে যেন তিনি নিজের শিকড়ের ইতিহাসই অনুসন্ধান করছেন।
ব্যান্স বলেন, ১৮৫০-এর দশকে দুলীপ সিংহের ব্রিটেনে আগমনই প্রমাণ করে, এই দেশে পাঞ্জাবি ইতিহাসের শিকড় কতটা পুরোনো। মহারাজার সন্তানদের মধ্যে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন রাজকুমারী ক্যাথরিন (১৮৭১-১৯৪২)।
ব্যান্সের তথ্যমতে, ক্যাথরিনের গল্প দীর্ঘদিন অনেকটাই অজানা ছিল। মা জার্মান হওয়ায় তিনি নাৎসি জার্মানির সময়ে নির্যাতিত ইহুদি পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এবং অনেককে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো থেকে রক্ষা করেছিলেন। ব্যান্সের ভাষায়—তাঁরা তাঁর ধর্ম, বংশ বা ঐতিহ্যের মানুষ না হলেও তাঁদের জন্য ক্যাথরিন যা করেছিলেন, তা ছিল ‘বিশুদ্ধ মানবিকতা’।
নিজেও অভিবাসী পরিবারের সন্তান হওয়ায় পাঞ্জাবি বংশোদ্ভূত অথচ ইংল্যান্ডে বেড়ে ওঠা দুলীপ সিংহের সন্তানদের জীবন ব্যান্সকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। ১৯৯০-এর দশকে তিনি স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে রাজপরিবারের সদস্যদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন। পরে প্রায় ৩০০ জন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁদের কেউ রাজপরিবারকে চিনতেন, কেউ পরিবারের হয়ে কাজ করতেন। অনেকেই রাজকুমারীদের কাছ থেকে পাওয়া স্মৃতিচিহ্ন ব্যান্সকে দিয়েছেন।
বর্তমানে ব্যান্সের সংগ্রহে দুলীপ সিংহের পোশাক, রাজকুমারীদের শাড়ি, খেলনা, চিঠি ও চিত্রকর্মসহ ওই পরিবারের দুই হাজারের বেশি নিদর্শন রয়েছে। এসবের কিছু এখন লন্ডনের কেনসিংটন প্যালেসে ‘দ্য লাস্ট প্রিন্সেসেস অব পাঞ্জাব’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হচ্ছে।
দুলীপ সিংহের কনিষ্ঠ কন্যা সোফিয়া নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় সুফ্রাজেট। তবে ব্যান্স তাঁর এই পরিচয় জানতে পারেন বহু বছর পর, সোফিয়ার এক গৃহকর্মীর মেয়ের সঙ্গে কথা বলার মাধ্যমে।
প্রদর্শনীর উপদেষ্টা অভিনেতা, লেখক ও অধিকারকর্মী জাসা আহলুওয়ালিয়া জানান, দুলীপ সিংহের পরিবারের ইতিহাস তাঁর নিজের মিশ্র ভারতীয়-ইংরেজ পরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তিনি বলেন, অ্যালভেডেন হলের বাইরের চেহারা ছিল খুবই ইংরেজ, কিন্তু ভেতরে ছিল ভারতীয় ঐতিহ্য। এই ইতিহাস প্রমাণ করে, ব্রিটেনে পাঞ্জাবি ও মিশ্র-ঐতিহ্যের মানুষের গল্প কোনো আধুনিক ঘটনা নয়; এটি দেশটির দীর্ঘ ও জীবন্ত ইতিহাসেরই অংশ।