হোম > বিশ্ব > ভারত

ভারতের সৌন্দর্যপণ্যের বাজারে জোয়ার এনেছে জেন-জি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: এএফপি

ভারতের তরুণ প্রজন্মের বদলে যাওয়া জীবনধারা ও সৌন্দর্যচর্চার প্রতি বাড়তে থাকা আগ্রহ দেশটির বিউটি ও পার্সোনাল কেয়ার খাতে এক বিশাল উত্থান ঘটাচ্ছে। বিশেষ করে জেনারেশন জেড বা জেন-জি এখন এই বাজারের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। দ্রুত বাড়তে থাকা এই বাজারটির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন বিশ্বের বড় বড় প্রসাধনী ও ভোক্তা পণ্য কোম্পানিগুলোও।

চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের বিলাসবহুল প্রসাধনী কোম্পানি ‘এস্তি লডার’ (Estée Lauder) ভারতের আয়ুর্বেদভিত্তিক ব্র্যান্ড ‘ফরেস্ট এসেনশিয়ালস’ পুরোপুরি অধিগ্রহণ করে। জুনে ফ্রান্সের ল’রিয়াল গ্রুপ ডিজিটাল পার্সোনাল কেয়ার ব্র্যান্ড ইনোভিস্ট-এর সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা কিনে নেয়। অন্যদিকে, ইউনিলিভারও গত কয়েক বছরে তাদের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিভাগের মাধ্যমে ভারতে অন্তত চারটি সৌন্দর্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছে।

বিবিসি জানিয়েছে, হিমালয়ের পাদদেশে একটি গ্যারেজ থেকে উদ্যোক্তা মীরা কুলকার্নির হাতে যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘ফরেস্ট এসেনশিয়ালস’-এর। দুই সন্তানের একক মা কুলকার্নি প্রায় দুই দশকে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি বৈশ্বিক পরিচিতি সহ বিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে পরিণত করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানের এই সাফল্য ভারতের সামগ্রিক বিউটি শিল্পের বিস্ফোরক প্রবৃদ্ধিরই প্রতিচ্ছবি।

২০২৫ সালে ভারতের সৌন্দর্যবাজারের আকার ছিল প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। ধারণা করা হচ্ছে, দশকের শেষ নাগাদ এটি বেড়ে প্রায় ৪ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাবে। অর্থাৎ দেশটির জিডিপি ও সামগ্রিক খুচরা বাজারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ গতিতে বাড়ছে এই খাত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ। একই সঙ্গে ইন্টারনেট, ই-কমার্স, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতি সৌন্দর্যপণ্যকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। একসময় সাধারণ সাবান বা ফেস পাউডারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা ভোক্তারা এখন স্কিন কেয়ার, নির্দিষ্ট উপাদানভিত্তিক পণ্য, ব্রণ নিয়ন্ত্রণ কিংবা ত্বক উজ্জ্বল করার নানা সমাধান সম্পর্কে সচেতন।

Redseer-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের মোট সৌন্দর্য ব্যয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ আসবে ই-কমার্স থেকে। পাঁচ বছর আগে এই হার ছিল মাত্র ৮ শতাংশ।

কোভিড-১৯ মহামারিও এই খাতের পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রেখেছে। লকডাউনের সময় মানুষ ব্যক্তিগত যত্ন ও আত্ম পরিচর্যার দিকে বেশি মনোযোগী হয়। একই সময়ে ভারতের ছোট ও মাঝারি শহরগুলোতেও দ্রুত ডিজিটাল সংযোগ বিস্তৃত হয়। ফলে কোরিয়া বা ইউরোপের নতুন স্কিন কেয়ার ট্রেন্ড, বিভিন্ন উপাদানের কার্যকারিতা এবং ডার্মাটোলজিক্যাল পণ্য সম্পর্কে সহজেই তথ্য পেতে শুরু করেন ভারতীয়রা।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চালক এখন জেন-জি। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, তারা মিলেনিয়ালদের তুলনায় স্কিন কেয়ার ও পার্সোনাল কেয়ারে প্রায় দ্বিগুণ ব্যয় করছে। Flipkart-এর তথ্য অনুযায়ী, তাদের বিউটি ও পার্সোনাল কেয়ার ক্রেতাদের ৫৬ শতাংশই জেন-জি এবং তাঁদের ৭০ শতাংশই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পণ্য সম্পর্কে জানার পর তা কেনেন। এ ছাড়া বিউটি পণ্যের প্রতি তিনটি অনলাইন অনুসন্ধানের মধ্যে দুটি আসে বড় শহরের বাইরের অঞ্চল থেকে।

Redseer-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতের বিউটি খাতে জেন-জি ও জেন আলফার ব্যয়ের অংশ ছিল ৩২ শতাংশ, যা ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামনে বাজারটি আরও পরিণত হবে। নির্দিষ্ট উপাদানভিত্তিক পণ্য, বিশেষজ্ঞ বা ডার্মাটোলজিস্ট-সমর্থিত ব্র্যান্ড এবং ত্বকের পুষ্টিকেন্দ্রিক নতুন ধারণা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির নেতৃত্ব দেবে। বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ভারতের অন্তত ১০ থেকে ১৫টি বিউটি কোম্পানির বার্ষিক আয় ২০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

আর তখন এই খাতে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি, নতুন অধিগ্রহণ ও একীভূতকরণের তৎপরতা আরও বাড়বে। জেন-জির হাত ধরে ভারতের সৌন্দর্যবাজার তাই এখন শুধু প্রসাধনীর ব্যবসা নয়, বরং দেশটির নতুন ভোক্তা অর্থনীতির অন্যতম বড় প্রবৃদ্ধির গল্প হয়ে উঠছে।