হোম > বিশ্ব > ভারত

পদত্যাগে নারাজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: ভারতের সংবিধানে এর সমাধান কী

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও রাজ্য রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ও জটিল সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছে। সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবি সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিতে সরাসরি অস্বীকার করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর এই অনড় অবস্থানের ফলে রাজ্য প্রশাসন, রাজভবন এবং নির্বাচন কমিশনের মধ্যে এক ত্রিমুখী সংঘাত শুরু হয়েছে। এটি ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে বিরল।

গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কালীঘাটের বাসভবনে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মেজাজে ক্যামেরার সামনে আসেন। তিনি বলেন, ‘বিজেপির ২০৭টি আসনের ম্যান্ডেট আসলে জনগণের রায় নয়, বরং এটি নির্বাচন কমিশন ও গেরুয়া শিবিরের এক পরিকল্পিত জালিয়াতির ফল।’ তিনি দাবি করেন, অন্তত ১০০টি আসনে ফলাফল ম্যানিপুলেট (জালিয়াতি) করা হয়েছে এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে তৃণমূলের কয়েক লক্ষ সমর্থকের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, গণনা কেন্দ্রে তাঁকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাকে পেটে ও পিঠে লাথি মারা হয়েছে, সিসিটিভি বন্ধ করে আমাকে গণনা কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইস্তফা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’

তাঁর এই ‘স্ট্রিট ফাইটার’ সুলভ আচরণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তিনি সহজে ক্ষমতার অলিন্দ ছাড়ছেন না।

সাংবিধানিক জটিলতা: রাজ্যপালের হাতে কী কী বিকল্প?

সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সংবিধানে মুখ্যমন্ত্রীকে পরাজয়ের পর পদত্যাগ করতে হবে—এমন কোনো সরাসরি ধারা নেই। তবে এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য। বর্তমানে যে আইনি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো:

১. অনুচ্ছেদ ১৬৪ (১) : মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভা রাজ্যপালের ‘সন্তোষ’ অনুযায়ী পদে আসীন থাকেন। রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস চাইলে বর্তমান সরকারকে বরখাস্ত করতে পারেন।

২. ফ্লোর টেস্ট: রাজ্যপাল মুখ্যমন্ত্রীকে বিধানসভায় তাঁর সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের নির্দেশ দিতে পারেন। যেহেতু সরকারি ফলাফল অনুযায়ী তৃণমূলের আসনসংখ্যা মাত্র ৮০ (সংখ্যাগরিষ্ঠতার থেকে ৬৮টি কম), তাই এই পরীক্ষায় পাস করা মমতার পক্ষে অসম্ভব।

৩. রাষ্ট্রপতি শাসন: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে রাজ্যপাল সংবিধানের ৩৫৬ ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি শাসনের সুপারিশ করতে পারেন। তবে বিজেপি যেহেতু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, তাই সরাসরি নতুন সরকারকে আমন্ত্রণ জানানোই হবে প্রথম অগ্রাধিকার।

নবান্নে আমলাদের ওপর কোপ

এদিকে কলকাতায় প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের রদবদল ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। মুখ্য সচিব দুষ্মন্ত নারিয়ালা লোক ভবন থেকে প্রাপ্ত নির্দেশ অনুযায়ী সমস্ত দপ্তরে এক জরুরি বার্তা পাঠিয়েছেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে ‘এক্সটেনশন’ বা চুক্তিতে নিযুক্ত সমস্ত অবসরপ্রাপ্ত আমলাকে অফিসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাঁদের দ্রুত সরকারি আবাসন ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নবান্নের প্রতিটি দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও নথিপত্র সংরক্ষণের জন্য বাড়তি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কোনো ফাইল যাতে দপ্তরের বাইরে না যায় এবং ডিজিটাল রেকর্ড যাতে নষ্ট না করা হয়, তার জন্য আর্থিক উপদেষ্টাদের সক্রিয় থাকতে বলা হয়েছে।

ভোট-পরবর্তী সহিংসতা থামছে না

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে অশান্তির খবর আসছে। বিশেষ করে আসানসোল, কুলটি, রানিগঞ্জ এবং বার্নপুরে তৃণমূলের একাধিক কার্যালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। কিছু কার্যালয় জোরপূর্বক গেরুয়া রঙে রাঙিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। যদিও বিজেপি নেতৃত্ব এই ঘটনার দায় অস্বীকার করেছে এবং একে ‘দুষ্কৃতকারীদের কাজ’ বলে দাবি করেছে।

এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, হিংসার ঘটনায় জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে; রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে প্রতিটি স্পর্শকাতর এলাকায় ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালাতে হবে; কেন্দ্রীয় বাহিনীকে মোতায়েন রেখে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

২০২৬-এর এই নির্বাচনে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন জিতে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে তাদের প্রথম সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, ভবানীপুরের মতো হাই-প্রোফাইল কেন্দ্রে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয় তৃণমূলের জন্য এক বড় ধাক্কা। বর্তমান বিধানসভার মেয়াদ ৭ মে শেষ হচ্ছে। তাই আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই সাংবিধানিক জট না কাটলে রাজ্য এক গভীর প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। বিজেপি ইতিমধ্যেই ৯ মে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শুরু করেছে, তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়েই এখন জল্পনা তুঙ্গে।

সঙ্গী করে ক্ষমতায় আরোহণ, সেই বিজেপির হাতেই পতন হয়েছে যে ৬ মুখ্যমন্ত্রীর

তৃণমূল শূন্য হলো পশ্চিমবঙ্গের ৮ জেলা, বাকিগুলোতেও মমতার ধরাশায়ী হওয়ার চিত্র

পশ্চিমবঙ্গে সচিবালয়ে শুদ্ধি অভিযান শুরু, অনেক আমলার দপ্তরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা

তামিলনাড়ুতে সরকার গঠনে বিজয়কে সহায়তা করবে কংগ্রেস, পেতে পারে ২ মন্ত্রিত্ব

নতুন চুক্তি: একে অপরের ভূখণ্ডে সেনা পাঠাতে পারবে ভারত ও রাশিয়া

মমতা পদত্যাগ না করলে তাঁকে বরখাস্ত করা হোক: হিমন্ত বিশ্ব শর্মা

সরকার গঠন করতে কংগ্রেসের সমর্থন চাইলেন বিজয়

খুলে নেওয়া হলো মমতার বাড়ির গলির মুখের ‘সিজার ব্যারিকেড’

কেন পদত্যাগ করব,‌ আমরা তো হারিনি: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

আসামে কংগ্রেসের জয় শুধুই মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে