ভারতের শীর্ষস্থানীয় দুটি আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাঁদের সমাবর্তনে প্রধান বিচারপতিকে প্রধান অতিথি হিসেবে না ডাকার দাবি জানিয়েছেন। কিছু বিতর্কিত মন্তব্য এবং শিক্ষার্থী বিক্ষোভে পুলিশি সহিংসতার রিট জরুরি ভিত্তিতে শুনতে অস্বীকৃতির জানানোয় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।
হায়দরাবাদের শীর্ষস্থানীয় আইনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘নালসার ইউনিভার্সিটি অব ল’-এর শিক্ষার্থীদের থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন ছড়িয়ে পড়েছে বেঙ্গালুরুর ‘ন্যাশনাল ল স্কুল অব ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটি’-তেও।
বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (বিসিআই) আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার হুমকি দিলেও প্রবল সমালোচনার মুখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৩ জুলাই, যখন নালসারের সমাবর্তনী ব্যাচের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এক ই-মেইলে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে সমাবর্তনের প্রধান অতিথি হিসেবে না জানানোর অনুরোধ করেন। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৪০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৪৫০ জন এই দাবিতে সমর্থন জানান।
শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভের মূল কারণ গত ২২ জুলাই প্রধান বিচারপতির একটি পদক্ষেপ। গত ২০ জুলাই নয়াদিল্লিতে শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত ‘কাকরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-এর শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস ও পেলেট গান ব্যবহার করে বলে অভিযোগ ওঠে। এই সহিংসতার ঘটনার জরুরি শুনানির জন্য এক আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানালে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমাদের সময় নষ্ট করবেন না।
সহিংসতার ভিডিও দেখার অনুরোধ করা হলে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, ‘আমাদের সময় নেই।’
ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রধান বিচারপতির এমন মন্তব্য প্রকাশের পর বিরোধী দল, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। নালসারের শিক্ষার্থীরা তাঁদের চিঠিতে লেখেন, ‘যিনি আন্দোলনকারী নাগরিকদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে অনীহা প্রকাশ করেন, তাঁর হাত থেকে সনদ গ্রহণ করা আমাদের শিক্ষা ও মূলবোধের পরিপন্থী।’
পরবর্তীতে অবশ্য প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত জানান, তাঁকে ভুলভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি শুনানি খারিজ করেননি, বরং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আবেদন জমা দিতে বলেছিলেন।
সমাবর্তনে প্রধান বিচারপতিকে বয়কটের জন্য শিক্ষার্থীদের এই আবেদনের পর ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয় যখন বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান এবং ক্ষমতাসীন বিজেপি সংসদ সদস্য মানন কুমার মিশ্র আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সমাবর্তন বন্ধের হুমকি দেন এবং আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধন না দেওয়ার হুঁশিয়ারি জানান।
তবে মানন কুমার মিশ্রর এই বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেন আইনজীবীদের একাংশ এবং খোদ প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত নিজেই। প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে’ এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের ক্ষেত্রে বার কাউন্সিলের হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নেই।
তীব্র সমালোচনার মুখে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিবৃতি প্রত্যাহার করে নেন বিসিআই প্রধান এবং শিক্ষার্থীদের কাছে লিখিতভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন।
তবে এই ক্ষমা প্রার্থনা শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারেনি। বেঙ্গালুরুর ‘ন্যাশনাল ল স্কুল অব ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটি’-এর শিক্ষার্থীরাও নালসারের শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে প্রধান বিচারপতি ও বিসিআই প্রধানকে তাঁদের সমাবর্তনে না ডাকার আহ্বান জানান।
এদিকে ভারতের গণমাধ্যম ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ জানিয়েছে, প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত গত রোববার বলেছেন, তিনি নালসারের সমাবর্তনের আমন্ত্রণ কখনোই গ্রহণ করেননি, তাই তাঁর উপস্থিত থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের এই অসন্তোষ হঠাৎ তৈরি হয়নি। এর সূত্রপাত ঘটে গত মে মাসে আদালতে দেওয়া তাঁর একটি অপ্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। বেকার যুবকদের ইঙ্গিত করে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, ‘কিছু তরুণ তেলাপোকার (কাকরোচ) মতো, যাদের কোনো কর্মসংস্থান নেই... তারা সাংবাদিক, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী বা আরটিআই কর্মী হয়ে সবাইকে আক্রমণ করতে শুরু করে।’
এই বক্তব্যের পর দেশজুড়ে চরম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। প্রধান বিচারপতি পরে দাবি করেন, জাল ডিগ্রিধারীদের উদ্দেশে তিনি এই কথা বলেছিলেন এবং তাঁর বক্তব্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তবে এই মন্তব্যের প্রতিবাদেই জন্ম নেয় একটি ব্যঙ্গাত্মক সামাজিক আন্দোলন—‘কাকরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে জানান, সংবিধান ও মৌলিক অধিকারের রক্ষক প্রধান বিচারপতির মুখ থেকে এমন মন্তব্য শুনে তিনি মর্মাহত হয়ে এই প্রতিবাদ শুরু করেন।
পরবর্তীতে এই সিজেপি আন্দোলন রূপ নেয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় ছাত্র বিক্ষোভে। পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে এই আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত ২৫ জুলাই তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পরও আদালতের মন্তব্য ও শিক্ষার্থী নির্যাতনের জল গড়িয়েছে দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় ও শীর্ষ আইন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে, যার রেশ এখনো স্পষ্ট।