রাশিয়া থেকে যাত্রা করা একটি তেলবাহী জাহাজকে ভূমধ্যসাগরে আটক করেছে ফ্রান্সের নৌবাহিনী। যুক্তরাজ্যের সরবরাহ করা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আজ বৃহস্পতিবার এই অভিযান চালানো হয়। ফরাসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞা এড়াতে রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ লক্ষ্য করেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
ভূমধ্যসাগরের দায়িত্বে থাকা ফরাসি সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ জানায়, আটক জাহাজটির নাম গ্রিনিচ। জাহাজটি রাশিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর মুরমানস্ক থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। জাহাজটি ভুয়া পতাকা ব্যবহার করে চলাচল করছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, ফরাসি নৌবাহিনী জাহাজটিকে আরও তল্লাশির জন্য একটি নোঙরস্থলে নিয়ে যাচ্ছে।
রাশিয়ার অর্থনীতিতে তেল থেকে পাওয়া আয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই আয়ের মাধ্যমেই প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে পারছেন বলে মনে করা হয়। একই সঙ্গে এই অর্থই সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ না বাড়িয়ে ও রুবলের বড় ধরনের পতন এড়িয়ে রুশ অর্থনীতিকে এখনো সচল রেখেছে।
ফ্রান্সসহ একাধিক দেশ রাশিয়ার শ্যাডো ফ্লিট (ছায়া বহর) বা গোপন তেলবাহী জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। ধারণা করা হয়, রাশিয়ার এই ছায়া বহরে ৪০০টির বেশি জাহাজ রয়েছে।
এই জাহাজগুলো সাধারণত পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ। সেগুলো কেনা হয় অস্পষ্ট মালিকানার প্রতিষ্ঠান দিয়ে, যাদের ঠিকানা থাকে নিষেধাজ্ঞাবহির্ভূত দেশগুলোতে। এরপর এসব জাহাজ নিষেধাজ্ঞা না দেওয়া দেশগুলোর পতাকা ব্যবহার করে তেল পরিবহন করে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ রুশ জাহাজ আটকানোর বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা ও নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’ পোস্টে একটি ছবি যুক্ত করা হয়, যেখানে দেখা যায়, একটি ফরাসি সামরিক হেলিকপ্টার জাহাজটির ওপর উড়ছে।
মাখোঁ আরও বলেন, এই শ্যাডো ফ্লিটের কার্যক্রম ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসী যুদ্ধের অর্থ জোগাতে ভূমিকা রাখছে।
ফরাসি সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই অভিযান যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত হয়েছে। যুক্তরাজ্যই প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে ফ্রান্সকে সরবরাহ করে, যার ফলে জাহাজটি আটক করা সম্ভব হয়। তাঁরা আরও জানান, জাহাজটি কমোরোস দ্বীপপুঞ্জের ভুয়া পতাকা ব্যবহার করছিল, যা পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত। জাহাজটির নাবিকেরা সবাই ভারতীয় নাগরিক। জাহাজটিকে স্পেনের দক্ষিণ উপকূলীয় শহর আলমেরিয়ার কাছে পশ্চিম ভূমধ্যসাগরে আটক করা হয়।
এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ফ্রান্সের নৌবাহিনী আটলান্টিক মহাসাগরে আরেকটি তেলবাহী জাহাজে অভিযান চালায়। সেটিকেও প্রেসিডেন্ট মাখোঁ রাশিয়ার শ্যাডো ফ্লিটের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করেছিলেন।
ওই জাহাজ রাশিয়ার প্রিমোরস্ক তেল টার্মিনাল থেকে যাত্রা করেছিল, যা সেন্ট পিটার্সবার্গের কাছে অবস্থিত। জাহাজটির নাম ছিল কখনো ‘পুষ্পা’, কখনো ‘বরাকাই’। নাম একাধিকবার পরিবর্তন করা হয়েছিল। সেটি বেনিনের পতাকা ব্যবহার করছিল।
ওই সময় পুতিন ঘটনাটিকে ‘সমুদ্রে ডাকাতি’ বলে আখ্যা করেন এবং দাবি করেন, ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে মাখোঁ এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
ফরাসি বিচার বিভাগ জানিয়েছে, ওই জাহাজের ক্যাপ্টেনকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আদালতে তোলা হবে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, অভিযানের সময় তিনি নাবিকদের সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।