রাশিয়ার একটি মালবাহী জাহাজ রহস্যজনক বিস্ফোরণের পর ভূমধ্যসাগরে ডুবে যাওয়ার ঘটনায় নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ‘উরসা মেজর’ নামের ওই জাহাজটি সম্ভবত উত্তর কোরিয়ার উদ্দেশে সাবমেরিনে ব্যবহৃত দুটি পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরের যন্ত্রাংশ বহন করছিল। ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর স্পেন উপকূল থেকে প্রায় ৬০ মাইল দূরে জাহাজটি ডুবে গিয়েছিল।
ঘটনাটিকে ঘিরে শুরু থেকেই গোপনীয়তা বজায় রেখেছে রাশিয়া ও স্পেন। তবে সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতা রহস্য আরও ঘনীভূত করেছে। প্রকাশ্য ফ্লাইট তথ্য অনুযায়ী—জাহাজডুবির ওই স্থানের ওপর দিয়ে গত এক বছরে অন্তত দুবার মার্কিন ‘নিউক্লিয়ার স্নিফার’ বিমান উড়ে গেছে। এ ছাড়া জাহাজডুবির এক সপ্তাহ পর সেখানে গিয়েছিল ‘ইয়ানতার’ নামের একটি রুশ গবেষণা জাহাজ, যাকে পশ্চিমা দেশগুলো গুপ্তচরবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ করে থাকে। ওই জাহাজ যাওয়ার পর আবারও চারটি বিস্ফোরণের শব্দ শনাক্ত হয়।
স্পেন সরকার গত ফেব্রুয়ারিতে জানায়, জাহাজটির রুশ ক্যাপ্টেন তদন্তকারীদের বলেছেন—উরসা মেজর জাহাজটিতে সাবমেরিনে ব্যবহৃত পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরের মতো দুটি রিঅ্যাক্টরের যন্ত্রাংশ ছিল। তবে সেগুলোতে পারমাণবিক জ্বালানি ছিল কি না, সেই বিষয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন না।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, জাহাজটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়ার উস্ত-লুগা বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে। আনুষ্ঠানিক নথিতে এর গন্তব্য দেখানো হয়েছিল রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় শহর ভ্লাদিভস্তক। কিন্তু তদন্তকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন—শুধু দুটি ক্রেন, শতাধিক খালি কনটেইনার এবং তথাকথিত ‘ম্যানহোল কভার’ পরিবহনের জন্য কেন এত দীর্ঘ সমুদ্রপথ বেছে নেওয়া হলো, যখন রাশিয়ার বিস্তৃত রেল নেটওয়ার্ক রয়েছে।
স্প্যানিশ তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, জাহাজটির প্রকৃত গন্তব্য ছিল উত্তর কোরিয়ার রাসন বন্দর। কারণ উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়ার কাছে পারমাণবিক প্রযুক্তিগত সহায়তা চেয়ে আসছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সহায়তার জন্য উত্তর কোরিয়া সৈন্য পাঠানোর পর দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, ২২ ডিসেম্বর স্প্যানিশ জলসীমায় প্রবেশের পর হঠাৎ গতি কমিয়ে ফেলে উরসা মেজর। স্প্যানিশ উদ্ধারকারী দল যোগাযোগ করলে জাহাজের পক্ষ থেকে জানানো হয় সব ঠিক আছে। কিন্তু প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর জাহাজটি জরুরি সহায়তা চেয়ে বার্তা পাঠায়। তখন এর ডান পাশে, সম্ভবত ইঞ্জিন কক্ষের কাছে, পরপর তিনটি বিস্ফোরণ ঘটে। এতে দুই নাবিক নিহত হন এবং জাহাজটি অচল হয়ে পড়ে।
১৪ জন জীবিত নাবিক লাইফবোটে করে জাহাজ ত্যাগ করেন। পরে স্পেনের উদ্ধারকারী জাহাজ তাদের উদ্ধার করে। তবে এর কিছুক্ষণ পর রুশ সামরিক জাহাজ ‘ইভান গ্রেন’ আশপাশের জাহাজগুলোকে দূরে সরে যেতে নির্দেশ দেয়। স্পেনের উদ্ধারকারীরা তখনো জাহাজে জীবিত কেউ আছে কি না তা খুঁজছিলেন।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, রাত ৯টা ৫০ মিনিটে ঘটনাস্থলের ওপর লাল ফ্লেয়ার ছোড়ে ইভান গ্রেন। এরপর আরও চারটি বিস্ফোরণ ঘটে। স্পেনের জাতীয় ভূকম্পন নেটওয়ার্ক একই সময়ে পানির নিচে বিস্ফোরণের মতো চারটি কম্পন শনাক্ত করে। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর উরসা মেজর পুরোপুরি ডুবে যায়।
রুশ মালিকপক্ষ ওবরোনলজিস্টিকস পরে দাবি করে, এটি ছিল সন্ত্রাসী হামলা। তারা জানায়, জাহাজের গায়ে ৫০ সেন্টিমিটার আকারের একটি গর্ত পাওয়া গেছে এবং চারদিকে ছড়িয়ে ছিল ধাতব টুকরা।
স্প্যানিশ তদন্তে ধারণা করা হয়েছে, জাহাজে আঘাত হানতে বিশেষ ধরনের ‘সুপারক্যাভিটেটিং টর্পেডো’ ব্যবহার করা হতে পারে। এই ধরনের উচ্চগতির টর্পেডো ব্যবহার করতে সক্ষম দেশ খুবই সীমিত—যুক্তরাষ্ট্র, কিছু ন্যাটো মিত্র, রাশিয়া ও ইরান। তবে কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, এটি পানির নিচে স্থাপন করা ‘লিম্পেট মাইন’-এর কাজও হতে পারে।
এদিকে, উত্তর কোরিয়া ২০২৫ সালের শেষ দিকে তাদের প্রথম পারমাণবিক সাবমেরিনের ছবি প্রকাশ করে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের ধারণা, রাশিয়া যদি সত্যিই সাবমেরিন রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি উত্তর কোরিয়াকে দিতে চেয়ে থাকে, তাহলে তা হবে অত্যন্ত বড় কৌশলগত পদক্ষেপ।
তবে এখনো পর্যন্ত কোনো দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘটনার দায় স্বীকার করেনি। জাহাজটির ধ্বংসাবশেষ প্রায় আড়াই হাজার মিটার গভীরে পড়ে আছে। তদন্তকারীদের মতে, সেখানেই হয়তো লুকিয়ে আছে উরসা মেজরের শেষ রহস্য।