ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মন্ত্রিসভা থেকে এবার পদত্যাগ করলেন নারী ও মেয়েদের সুরক্ষা এবং সহিংসতাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জেস ফিলিপস। বাংলাদেশ সময় আজ মঙ্গলবার (১২ মে) সন্ধ্যায় এই খবর দিয়েছে বিবিসি। পদত্যাগপত্রে জেস লিখেছেন—তিনি কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী।
এদিকে দলের নির্বাচিত এমপিরাও স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করে একে একে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর পদত্যাগ দাবি করা এমপির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮১ জনে। সমর্থন প্রত্যাহার করে লেবার এমপি পলেট হ্যামিল্টন স্টারমারকে পদত্যাগ না করার জন্য ‘একগুঁয়ে শিশু’ বলে খোঁচা দিয়েছেন।
তবে পদত্যাগ না করতে এখনো অনড় স্টারমার। ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভেতরে তাঁর বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান বিদ্রোহ ব্রিটিশ রাজনীতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। গত সপ্তাহের ভয়াবহ স্থানীয় নির্বাচনী ফলাফলের পর দলটির বহু এমপি প্রকাশ্যে স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করতে শুরু করেন।
আজ মন্ত্রিসভার এক জরুরি বৈঠকে স্টারমার জানান, তাঁকে সরিয়ে দিতে যে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া রয়েছে, তা এখনো শুরু হয়নি। তিনি বলেন, ‘দেশ এখন চায় আমরা সরকার পরিচালনার কাজে মনোযোগ দিই।’
একই সঙ্গে গত ৪৮ ঘণ্টার রাজনৈতিক অস্থিরতাকে তিনি সরকারের জন্য ক্ষতিকর ও অর্থনীতির জন্য ব্যয়বহুল বলে উল্লেখ করেন।
লেবার পার্টির ৪০৩ জন এমপির মধ্যে অন্তত ৮১ জন ইতিমধ্যে স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। দলের ভেতরে বিভক্তিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ ব্যক্তিগতভাবে স্টারমারকে নিজের অবস্থান বিবেচনা করতে বলেছেন। তাঁর নেতৃত্বে আস্থা হারানোর অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করা সরকারের সহকারী ও মন্ত্রীদের পাল্লাও ভারী হচ্ছে।
স্টারমারের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা জানিয়েছেন, তিনি সহকর্মীদের মতামত শুনছেন এবং তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। তবে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দেয়নি।
ক্ষমতায় আসার পর থেকেই স্টারমার নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ব্যর্থতা, কল্যাণ সংস্কার, করনীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একাধিক ইউটার্ন ও জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট তাঁর জনপ্রিয়তায় ধাক্কা দিয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে পিটার ম্যান্ডেলসনকে নিয়োগ দেওয়ার পর তথ্যফাঁসের অভিযোগে তদন্ত শুরু হওয়ায় তাঁর বিচারবোধ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
গত সপ্তাহের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টি প্রায় ১ হাজার ৫০০ কাউন্সিলর হারায়। স্কটল্যান্ডে দলটি পিছিয়ে পড়ে এবং তাদের শক্ত ঘাঁটি ওয়েলসেও তৃতীয় স্থানে নেমে যায়। এর পর থেকেই স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ তীব্র হয়ে ওঠে।
গতকাল সোমবার লন্ডনে এক ভাষণে স্টারমার নির্বাচনী পরাজয়ের দায় স্বীকার করলেও তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, তিনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। তিনি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘ব্রিটেনের আত্মার জন্য লড়াই’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং সতর্ক করেন, লেবার ব্যর্থ হলে দেশ ‘অন্ধকার পথে’ চলে যেতে পারে।
এদিকে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাব্য মুখ হিসেবেও কয়েকজনের নাম সামনে আসছে। ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ও সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনারকে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের নামও আলোচনায় রয়েছে, যদিও তিনি প্রকাশ্যে নেতৃত্বের দৌড়ে থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব অর্থনীতিতেও পড়েছে। ব্রিটিশ পাউন্ডের মান কমেছে, শেয়ারবাজারে পতন হয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণের সুদ বেড়েছে। আজ সকালে এফটিএসই-১০০ সূচক এক শতাংশের বেশি কমে যায়।
সব মিলিয়ে কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে। মাত্র দুই বছর আগে বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে ক্ষমতায় আসা লেবার পার্টি এখন নিজেদের নেতৃত্ব সংকটেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।