সার্বিয়ায় পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশন এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দর ভুচিচের সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে ব্যর্থ হওয়ার দায় স্বীকার করে দর্শকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে দেশটির একটি টেলিভিশন চ্যানেল। গত রোববারের নির্বাচনে ভুচিচের দল অপ্রত্যাশিতভাবে পরাজিত হওয়ার পর এ ঘোষণা দেয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম রেডিও টেলিভিশন ভয়ভোদিনা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
এদিকে, নির্বাচনে বিজয়ী পক্ষ ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ আন্দোলন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দূর করার পরিকল্পনা করছে। এ পরিস্থিতিতে দেশটির সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক পরিবর্তন এবং কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মিত্র হিসেবে পরিচিত ভুচিচ প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে টানা ১২ বছর সার্বিয়া শাসন করেছেন। তবে এবারের নির্বাচনে তাঁর দলকে পরাজিত করে স্টুডেন্ট লিস্ট নামে একটি জনপ্রিয় আন্দোলন। নির্বাচনের ফলাফলকে ভুচিচের দলের ঐতিহাসিক পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় একটি প্রদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম রেডিও টেলিভিশন ভয়ভোদিনার সংবাদ উপস্থাপক গোরান এরোর বলেন, ‘বহু বছর ধরে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা নীরব থেকেছি, চোখ বন্ধ করে থেকেছি, একপেশেভাবে ঘটনাবলি তুলে ধরেছি এবং প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করতে ব্যর্থ হয়েছি। এ জন্য আমরা আমাদের দর্শকদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।’
ভুচিচের দলের পরাজয়ের পর রেডিও টেলিভিশন ভয়ভোদিনার ভারপ্রাপ্ত প্রধান সম্পাদক নেনাদ চাচিচ পদত্যাগ করেছেন। একই সঙ্গে চ্যানেলটি তাদের সংবাদ সম্প্রচার শুরু করেছে স্টুডেন্ট লিস্টের নির্বাচনী বিজয় উদ্যাপনের দৃশ্য দিয়ে। নির্বাচনের আগের রাতে এসব দৃশ্য সম্প্রচার করতে ব্যর্থ হয়েছিল চ্যানেলটি। ভুচিচের শাসনামলে পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশনের অভিযোগ তুলে দেশটির ছাত্র আন্দোলন জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদত্যাগ দাবি করেছে।
এদিকে, সোমবার সন্ধ্যায় বিক্ষোভকারীরা ইনফর্মার টিভি নামে আরেকটি টেলিভিশন চ্যানেলের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। ওই সময় চ্যানেলটিতে সরাসরি সম্প্রচার চলছিল। প্রায় ৩০ জন বিক্ষোভকারী সংবাদকক্ষে ঢুকে চ্যানেলটির প্রধান সম্পাদক ও মালিক দ্রাগান ভুচিচেভিচকে ঘিরে ধরেন। এ সময় বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ ‘মুক্ত সার্বিয়ায় এভাবেই হয়’ এবং ‘ভুচিচ এখন কোথায়?’ বলে স্লোগান দেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ভুচিচেভিচকে গ্রেপ্তারেরও দাবি জানান।
২০২৪ সালে সার্বিয়ার নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। টানা দুই বছর ধরে চলা এসব গণবিক্ষোভের ধারাবাহিকতায় এবারের নির্বাচনে ভুচিচের দলের ঐতিহাসিক পরাজয় ঘটে। বিক্ষোভ ও পদযাত্রার পুরো সময়জুড়ে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত অভিযোগ করে আসছিলেন, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত রেডিও টেলিভিশন অব সার্বিয়া (আরটিএস) তাঁদের ক্রমবর্ধমান আন্দোলনের খবর যথাযথভাবে প্রচার করছে না।
মঙ্গলবার এক চিঠিতে শিক্ষার্থীরা আরটিএসের মহাপরিচালক, তাঁর উপপ্রধান, সংবাদ পরিবেশনের দায়িত্বে থাকা প্রধান সম্পাদক এবং সব সংবাদ সম্পাদকের পদত্যাগ দাবি করেন। চিঠিতে তাঁরা বলেন, ‘আমরা আরটিএসের মহাপরিচালক, তাঁর উপপ্রধান, সংবাদ পরিবেশনের দায়িত্বে থাকা প্রধান সম্পাদক এবং সব সংবাদ সম্পাদকের পদত্যাগ দাবি করছি।’ শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থী ও অন্যান্য নাগরিকদের মতামতের কারণে তাঁদের লক্ষ্য করে অপমানজনক মন্তব্য ও বার্তা প্রচারের ক্ষেত্রে কোনো সমালোচনা ছাড়াই সেগুলো সম্প্রচার করাকে আমরা বিশেষভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করি।’
নির্বাচনের রাতে ভুচিচ পরাজয় স্বীকার করার পর রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম আরটিএস বেলগ্রেডের ঘটনাবলির সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। অথচ রাজধানীজুড়ে তখন বিপুলসংখ্যক মানুষ ভোররাত পর্যন্ত নির্বাচনী বিজয় উদ্যাপন করছিলেন।
প্রায় সব ভোট গণনা শেষে দেখা গেছে, স্টুডেন্ট লিস্ট আন্দোলন মোট ভোটের ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ পেয়েছে। এর ফলে ২৫০ আসনের সংসদে আন্দোলনটি প্রায় ১৪০টি আসন পেতে যাচ্ছে। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে অন্য কোনো দলের সঙ্গে জোট গঠন ছাড়াই এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে আন্দোলনটি। চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে নেতৃত্ববিহীন এই আন্দোলন একজন প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করবে এবং নতুন সরকার গঠন করবে।
রেডিও টেলিভিশন ভয়ভোদিনার ক্ষমা চাওয়ার ঘটনাটি হাঙ্গেরির রাষ্ট্রায়ত্ত প্রধান টেলিভিশন চ্যানেলের একটি পদক্ষেপের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। গত এপ্রিলে হাঙ্গেরির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের ফিদেস দলের নির্বাচনী পরাজয়ের পর ওই চ্যানেলটি একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়।
এর তিন মাস পর হাঙ্গেরির চ্যানেলটি কালো পর্দায় একটি বার্তা প্রদর্শন করে। তাতে লেখা ছিল, ‘জনমাধ্যম মিথ্যা বলতে পারে না। বহু বছর ধরে তা করার জন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী।’
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের (আরএসএফ) ২০২৬ সালের বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে সার্বিয়ার অবস্থান ১০৪ তম। দেশটির ইতিহাসে এটিই সর্বনিম্ন অবস্থান। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বলকান অঞ্চল মিলিয়েও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে সার্বিয়ার অবস্থান সবচেয়ে খারাপ।